আষাঢ়ের একদম শেষ সময়ে এসে রাজধানী ঢাকায় আছড়ে পড়েছে প্রকৃতির রুদ্ররূপ। গভীর রাত থেকেই বিরতিহীনভাবে চলছে বৃষ্টি, আর এই কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো রাজধানী। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে কোথাও কোথাও হাঁটু সমান, আবার নিচু এলাকাগুলোতে রীতিমতো কোমর সমান পানি জমে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
আজ সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় ভোরে যারা জীবিকার তাগিদে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হয়েছিলেন, তারা পড়েছেন সবচেয়ে বড় বিপাকে। শেষ আষাঢ়ের এই আকস্মিক বৃষ্টিতে রাজধানীর নিচু অলিগলিগুলোতে যেন লোকজনকে বাধ্য হয়ে সাঁতার কেটে পথ চলতে হচ্ছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, দিনমজুর ও সাধারণ পথচারীদের পড়তে হয়েছে অবর্ণনীয় এবং অন্তহীন দুর্ভোগের মুখে।
আজকের এই জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি চত্বর, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়াদাবাদ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট যাওয়ার নতুন রাস্তা, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট এবং ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকাসহ মোহাম্মদপুরের কিছু অংশ।
এছাড়া শনির আখড়া, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বংশাল ও নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর-১৩, কালশী, হাতিরঝিলের কিছু অংশ, গুলশান লেকপাড়, কালাচাঁদপুর এবং বারিধারা এলাকার সংযোগ সড়কসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে।
সড়কের এই বেহাল দশার কারণে স্বাভাবিক যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন হাজারো চাকরিজীবী।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে সর্বশেষ মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, চলতি মাসে একক দিনে এই পরিমাণ বৃষ্টি আগে দেখা যায়নি। আর সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ কিলোমিটারে।
আবহাওয়া অফিস আরও সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, আজ সারা দিনই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের মাঝারি থেকে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সকালে ভারী বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি যেমন খুবই কম ছিল, ঠিক তেমনি গণপরিবহনও ছিল প্রায় অনুপস্থিত। ফলে রাস্তায় বের হওয়া মানুষদের অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজার থেকে জরুরি কাজে গুলশানের উদ্দেশে রওনা হওয়া আব্দুস সালাম নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ভোর থেকেই ঝুম বৃষ্টি চলায় রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন দুটোই খুব কম ছিল। কিন্তু কারওয়ান বাজার থেকে গুলশান আসার পথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মূল সড়ক পানিতে ডুবে থাকতে দেখেছেন তিনি, যা স্বাভাবিক যাতায়াতকে রীতিমতো এক বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।
একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান সিএনজিচালক আনোয়ার হোসেন। তিনি বিজয় সরণি ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের দিকে আসার পথে দেখেন যে, একাধিক সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানির নিচে।
জমে থাকা সেই গভীর পানিতে দু-একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে বিকল হয়ে পড়ায় চালকদের নিরুপায় হয়ে নোংরা পানি ঠেলে গাড়ি নিয়ে যেতেও দেখা গেছে। রাস্তায় তীব্র যানজট না থাকলেও যারা প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে বেরিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককেই এই নোংরা পানির জলাবদ্ধতার ভোগান্তি মাড়িয়েই পথ চলতে হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে বিশেষ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয়েছে, রাতব্যাপী এই রেকর্ড ভাঙা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানীর ব্যস্ততম কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের উভয় পাশে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। স্টেশন এলাকায় আসা সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের চরম নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সচল করতে সড়কে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনে কাজ করে যাচ্ছে ডিএনসিসির কুইক রেসপন্স টিম।
সময়ের আলো/জেডি