চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ভয়াবহ বন্যার পঞ্চম দিনে কিছু কিছু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমলেও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। পাঁচ দিন ধরে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করা এই অঞ্চলের মানুষ এখন লড়ছেন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও চরম অর্থসংকটের সঙ্গে। এরই মধ্যে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট— বন্যাকে পুঁজি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি এবং নৌকা ও যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়।
দুর্গতদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই চরম সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালক অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এতে কেবল স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও চরম বিপাকে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্ষেপ, বন্যা আমাদের জন্য সর্বনাশ হলেও, কিছু মানুষের জন্য যেন পৌষ মাস।
উপজেলার কেঁওচিয়া, বাজালিয়া, এওচিয়া, ছদাহা, সোনাকানিয়া, ঢেমশা, খাগরিয়া, চরতী, আমিলাইষ, নলুয়া ও পশ্চিম ঢেমশাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পরিস্থিতি এখনো থমথমে। কোথাও পানি হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও এখনো বুকসমান পানি থৈ থৈ করছে। বহু বাড়িঘরে এখনো নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো উপায় নেই।
যে-সব ঘর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে, সেগুলোতে জমে আছে পুরু কাদার স্তর। খাট, আলমারি, সোফা, কাপড়চোপড়, বই-খাতা, চাল-ডাল, রান্নার সরঞ্জাম, ফ্রিজ, টেলিভিশন ও মোটরসহ গৃহস্থালির সবকিছু পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনি গ্রামের বাসিন্দা নুরুজ্জামান বলেন, ঘরের ভেতর গত চারদিন বুকসমান পানি ছিল। এখন কিছুটা নামলেও কোমর পর্যন্ত পানি রয়ে গেছে। ঢেমশা ইউনিয়নের গৃহিণী হাসিনা বেগম জানান, তার রান্নাঘরে চাল, ডাল বা মশলা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। নেই বিশুদ্ধ পানিও। এমনকি শিশুদের শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে।
বন্যার প্রথম দুই-তিন দিন মানুষ ঘরে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে পার করলেও এখন সেই মজুত শেষ। ফলে অনেক পরিবার এখন ত্রাণের আশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। আবার যাদের কিছু কেনার সামর্থ্য আছে, বাজারে গিয়ে তাদেরও পকেট ফাঁকা হচ্ছে চড়া দামে।
চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, শিশুখাদ্য, বোতলজাত পানি, খাবার স্যালাইন, মোমবাতি ও দিয়াশলাইয়ের চাহিদা বাড়ায় কিছু অসাধু দোকানি এসব পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
টানা কয়েকদিন বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতির চাহিদা তুঙ্গে। চরতি ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, সন্ধ্যা নামলেই চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোমবাতি ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেই মোমবাতিও এখন চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। বাজালিয়ার বাসিন্দা মোত্তাকিন ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, পাঁচ দিন ধরে কোনো কাজ নেই, হাতে টাকাও নেই। এর মধ্যে বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি।
চলতি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যাতায়াত ভাড়া নিয়ে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলার বহু গ্রামে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন নৌকা। আর এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মাঝিরা কয়েক গুণ বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছেন।
নলুয়া ইউনিয়নের এক বাসিন্দা জানান, এক অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে নৌকাচালকের চাওয়া চড়া ভাড়াই দিতে হয়েছে। দুর্যোগের মুহূর্তে দর-কষাকষির কোনো সুযোগ থাকে না।
একই সংকটে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ত্রাণ সহায়তাকারীরাও। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়কারী বলেন, আমরা এক হাজার পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু নৌকা ও যাতায়াত ভাড়া অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় বাজেটের একটা বড় অংশ এখানেই চলে গেছে। বাধ্য হয়ে আমাদের ত্রাণের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হয়েছে।
যেসব এলাকায় সড়ক আংশিক সচল রয়েছে, সেখানে সিএনজি ও অটোরিকশা চালকেরাও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। কেরানীহাটের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, স্বাভাবিক সময়ের ৫০ টাকার ভাড়া এখন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দাবি করা হচ্ছে।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের। অনেক ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। টানা পাঁচ দিন দোকানপাট বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে শিশু ও বৃদ্ধদের মাঝে জ্বর, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দুর্গত সাধারণ মানুষের দাবি, দুর্যোগের এই মুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন খাতের নৈরাজ্য বন্ধে প্রশাসনের কঠোর ও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলে তাদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমতো।
তবে বন্যাকে কেন্দ্র করে এই মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পানি ধীরে ধীরে নামলেও ক্ষতির গভীরতা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা আর বাড়তি ব্যয়ের চাপ যেন সাতকানিয়াবাসীকে ক্রমশ পিষ্ট করছে। এখন তাদের মনে একটাই প্রশ্ন— দুর্যোগের এই কঠিন সময়েও কি মানুষের অসহায়ত্বই হবে কিছু মানুষের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের হাতিয়ার?
সময়ের আলো/জোই