চারদিকে শুধু বন্যার পানি। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, উঠান— সবকিছুই পানির নিচে। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানও তলিয়ে গেছে। ফলে মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানাতেও পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে। লাশের গোসল দেওয়া থেকে শুরু করে দাফন— সবকিছুই করতে হয়েছে বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে এমনই হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকান (৬০)। গত শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেলে তিনি মারা গেলে পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়— তাকে কোথায় দাফন করা হবে?
স্থানীয়দের ভাষ্য, ফোরকানের বাড়িসহ পুরো এলাকা কয়েক দিন ধরে বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। বসতঘরের উঠান থেকে পারিবারিক কবরস্থান পর্যন্ত কোমরসমান পানি। ফলে বাড়িতে মরদেহের গোসল দেওয়া যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি পরিবারের পূর্বপুরুষদের কবরের পাশে তাকে শায়িত করার সুযোগও মেলেনি।
স্বজনরা জানান, মৃত্যুর পর কয়েকজন মিলে একটি ভেলায় ফোরকানের মরদেহ তুলে প্রায় ৩০০ মিটার পানির ওপর ভাসিয়ে শুকনা জায়গায় নিয়ে যান। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাট এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে লাশের গোসল, কাফন ও জানাজার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
রাত ১০টার দিকে ফকির মুড়া ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন তার বড় ছেলে হাফেজ রাশেদুল ইসলাম। পরে পারিবারিক কবরস্থানের পরিবর্তে কাছের একটি পাহাড়ের সরকারি খাসজমিতে তাকে দাফন করা হয়।
ফোরকানের ছেলে রাসেল উদ্দিন বলেন, আমাদের বাড়ির পাশেই পারিবারিক কবরস্থান। দাদা-দাদিসহ পরিবারের সবার কবর সেখানে। বাবা সবসময় বলতেন, মৃত্যুর পর যেন তাকেও তাদের পাশেই দাফন করা হয়। কিন্তু বন্যার কারণে সেই শেষ ইচ্ছাটুকুও পূরণ করতে পারিনি। কবরস্থানে তখন কোমরসমান পানি ছিল।
কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন জানান, ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। ফোরকানের বাড়ি, চলাচলের রাস্তা ও পারিবারিক কবরস্থান প্লাবিত থাকায় ভেলায় করে মরদেহ সরিয়ে দূরে নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিবন্দি। পানি কিছুটা কমলেও এখনো পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে, প্রায় চার লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাঙ্গু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। উজানের ঢল ও সাগরের জোয়ারের কারণে পানি ধীরে নামছে।
ফলে অনেক এলাকায় শুধু মানুষের বসতভিটাই নয়, কবরস্থানও এখনো পানির নিচে রয়ে গেছে। এতে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে— এমনকি মৃত্যুর পরও মিলছে না স্বাভাবিক দাফনের সুযোগ।
সময়ের আলো/জোই