রাজশাহীতে মাছ চাষে বিপ্লব, দৈনিক বিক্রি ২০ কোটি টাকা

মাহী ইলাহি, রাজশাহী

সারাদেশ

রাজশাহী বিভাগে রুই-কাতলাসহ কার্পজাতীয় মাছ চাষে বিপ্লব ঘটেছে। ৮ জেলায় বছরে উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিকটনের বেশি মাছ। লাভজনক

2026-07-13T03:48:04+00:00
2026-07-13T03:48:04+00:00
 
  সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
রাজশাহীতে মাছ চাষে বিপ্লব, দৈনিক বিক্রি ২০ কোটি টাকা
মাহী ইলাহি, রাজশাহী
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৩:৪৮ এএম 
ছবি : সময়ের আলো
রাজশাহী বিভাগে রুই-কাতলাসহ কার্পজাতীয় মাছ চাষে বিপ্লব ঘটেছে। ৮ জেলায় বছরে উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিকটনের বেশি মাছ। লাভজনক হওয়ায় আগ্রহও বাড়ছে চাষিদের। রাজশাহী বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন এই মাছ পাঠানো রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে। আর এতে বিক্রি হচ্ছে ২০ কোটি টাকারও বেশি মাছ। রাজশাহীতে গত কয়েক বছরে বেড়েছে পুকুরের সংখ্যাও। ফসলে লোকসান হওয়ায় বাধ্য হয়ে পুকুর খনন করে মাছ চাষে নামছেন চাষিরা। আর মাছ চাষেই লাভের মুখ দেখছেন তারা। অন্য ফসলের চেয়ে মাছ চাষ তুলনামূলকভাবে বেশ লাভজনক হওয়ায় এ পেশায় ঝুঁকছেন অনেকে।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, আগে শুধু রাজশাহীতে মিশ্র প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ হতো। এখন সেটা বিভাগের অন্য জেলাতেও হচ্ছে। পুকুরে প্রধান মাছ যদি রুই হয় তবে সিলভার কার্প, কাতলাসহ দেশি ছোট মাছও চাষ করা হয়। এর ফলে পুকুরে ভারসাম্য রক্ষা হয়। এই জেলা থেকে বড় মাছ পাঠানোর পাশাপাশি দেশি পাবদা, শিং, কই, মাগুর চাষ হয়। রীতিমতো সেগুলো রাজশাহীর বাইরে একটা বড় ধরনের বাজার তৈরি করে ফেলেছে। এ ছাড়া পাবদা মাছ নিয়মিত ভারতে রফতানি হচ্ছে। সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানান, এখানকার চাষিরা নিয়ম মেনে মাছ চাষ করেন। তারা বছরে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে মাছ চাষবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া তারা নিয়মিত কৃষকের মাছ প্রদর্শনের মতো কর্মসূচি পালন করেন।

মৎস্য অধিদফতর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় জানিয়েছে, বিভাগের আটটি জেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি। মাছচাষি আছেন সংখ্যা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬টি। বছরে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে দেড় লাখ মেট্রিকটন মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, ২৪ বছর আগে এই জেলা থেকে তাজা মাছ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ অন্তত ২৫টি জেলায় প্রতিদিন তাজা মাছ পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে রাজশাহীর বাইরের মানুষ ফরমালিনমুক্ত মাছ খেতে পারে। ফলে এ জেলার মাছের চাহিদা বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, প্রতিদিন বিকাল থেকে ভোররাতের মধ্যে প্রায় ৫০০ ট্রাকের বেশি তাজা মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। প্রতি ট্রাকে কমপক্ষে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাছ থাকে। সেই হিসাবে প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার বেশি এই তাজা মাছ বিক্রি হয়।

রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ চাষ হয় পবা উপজেলায়। পারিলা ইউনিয়নে ঢুকতেই চোখ পড়ে পুকুর আর পুকুর। সেখান থেকে মাছ ধরা হচ্ছে। কিছুটা দূরে গিয়ে তা রাস্তায় দাঁড়ানো পানিভর্তি ছোট-বড় ট্রাকে তোলা হচ্ছে। এই পারিলা গ্রাম থেকেই প্রতিদিন ৫০ ট্রাকের মতো তাজা মাছ যায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে। আর পুরো রাজশাহী থেকে যায় ২০০ ট্রাকের বেশি তাজা মাছ।

পারিলা গ্রামের মোশারফ হোসেন ১৪ বছর ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ পাঠান। প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর তার পুকুর আছে। তিনি জানান, একসময় রাজশাহীতেই মাছ বিক্রি করতে হতো। দাম তেমন পাওয়া যেত না। পরে তারা ট্রাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ নেওয়া শুরু করেন। সেই সময় ট্রাকে এক-দুজন লোক রাখতে হতো। তারা সারা রাস্তা পানিতে পা দোলাতেন। 

কিন্তু এখন শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দেওয়া হয়। সেই মেশিন সারা রাস্তায় চলে। এতে মাছ পুকুরের মতো করে চলে যায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। দামও ভালো পাওয়া যায়। ওই দিন এক ট্রাকে তিনি ১ হাজার ২০০ কেজি মাছ নিয়ে যান ঢাকার নিউমার্কেটে। সেদিন তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয় ওই মাছ। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার গোলাম সাকলাইন ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নে অনার্স পড়াকালে নিজ এলাকায় মাত্র দুই বিঘা জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। ৭ হাজার টাকা পুঁজিতে শুরু করা চাষে প্রথমবারেই লাভ করেন ৬ হাজার টাকা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বর্তমানে ১ হাজার বিঘা জমির পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে ১৫২ জনের। 

তিনি বলেন, কৃষির সঙ্গে মাছচাষকে আমি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। মাছচাষ করব বলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু আমার পরিবারের সদস্যরা সে সময় কেউ এই পেশায় আসতে দিতে চাননি। সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মাছ চাষ করে যাচ্ছি। এখন আমার পুকুরের প্রায় ১ হাজার বিঘা আয়তন। আমার এখান থেকে প্রতিদিন ২০টির মতো ট্রাক রাজধানীতে মাছ নিয়ে যাচ্ছে।

মিঠা পানির কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে দেশের মধ্যে শীর্ষে রাজশাহী বিভাগের মধ্যে নাটোর ও নওগাঁয় মাছের উৎপাদন ও কেনাবেচা বেশি হয়। তবে এসব অঞ্চলের পুকুরগুলোতে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাবদা, ট্যাংরা শিংসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ চাষ করা হয়। এসব মাছ পুকুর থেকে তুলে বিশেষ সংরক্ষণের মাধ্যমে জীবিত অবস্থায় সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

দুর্গাপুর উপজেলার আরেক মৎস্যচাষি ইদ্রিস আলী বলেন, এই উপজেলা থেকে ৫০ ট্রাকের বেশি মাছ ঢাকায় যায়। তবে বর্তমানে মাছের দাম কিছুটা কমেছে। খাদ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, মাছের দাম তেমন বাড়েনি। এতে লাভ কম হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকায় মাছ নিতে বাড়তি ট্রাকভাড়া গুনতে হচ্ছে তিন-চার হাজার টাকা। মৎস্য অধিদফতর থেকে আর্থিক কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তবে নানা রকম পরামর্শ, সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে উপকৃত হওয়া যায়।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   রাজশাহী  মাছ চাষ  বিপ্লব  দৈনিক বিক্রি  কোটি টাকা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: