নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় নিহত বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধার পরিচয় অবশেষে জানা গেছে। স্টেশন এলাকায় ‘ববি বেগম’ নামে পরিচিত এই নারীর প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম (৭০)। প্রায় ২৫ বছর আগে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। এরপর থেকে পরিবার তাকে মৃত বলেই জেনে আসছিল। কিন্তু ফেসবুকে তার মৃত্যুর খবর ও ছবি দেখে স্বজনরা তাকে শনাক্ত করেন। শনিবার (১২ জুলাই) তারা মেথিকান্দায় এসে তার কবর জিয়ারত করেন।
ওয়াহিদা বেগম বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও আনিসা বিবির বড় মেয়ে। স্থানীয় ইউপি সদস্য, প্রতিবেশী, গাবতলী মডেল থানা এবং ভৈরব রেলওয়ে থানা তার পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
গাবতলী মডেল থানার ওসি রাকিব হোসেন জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে স্বামীর মৃত্যু ও একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি ওয়াহিদা। বাবার বাড়িতে থাকাকালে ছোট বোনের সঙ্গে অভিমান করে একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজ করেও তার সন্ধান পাননি। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি নিজের পরিচয়ও কাউকে জানাতে পারেননি।
স্বজনরা জানান, বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্বামী এবং জন্মের পরপরই একমাত্র মেয়েকে হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ওয়াহিদা। দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজির পর পরিবার ধরে নিয়েছিল, তিনি আর বেঁচে নেই।
ওয়াহিদার ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে রেলস্টেশনে এক বৃদ্ধা নিহত হওয়ার খবর দেখে তার স্ত্রী ছবিটি দেখে সন্দেহ করেন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখালে সবাই নিশ্চিত হন, নিহত নারীই ওয়াহিদা বেগম।
ভাগনে গোলাম রব্বানী বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে অভিমান করেই খালা বাড়ি ছেড়েছিলেন। ২৫ বছর পর তাকে খুঁজে পেলাম, কিন্তু তখন তিনি আর বেঁচে নেই।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাড়ি ছাড়ার পর ওয়াহিদা মেথিকান্দা রেলস্টেশনেই আশ্রয় নেন। সেখানকার মানুষ তাকে ‘ববি বেগম’ নামে চিনত। তিনি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দিতেন, শৌচাগার পরিষ্কার করতেন এবং মানুষের দেওয়া সহায়তায় জীবন চলত। রাতে স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে থাকতেন।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় দুই যুগ আগে একটি ট্রেন থেকে নেমে তিনি স্টেশনেই থেকে যান। বিনা পারিশ্রমিকে স্টেশন পরিষ্কার রাখতেন। মানুষের দেওয়া ৫-১০ টাকা করে দীর্ঘদিন ধরে কিছু অর্থ জমিয়েছিলেন। সেই টাকাই লুট করতে তার ওপর হামলা চালানো হয়।
গত ৪ জুলাই রাত ২টার দিকে স্টেশনের পরিত্যক্ত কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তরা তাকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং জমানো টাকা লুট করে নেয়। হামলায় চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ৭ জুলাই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
স্বজনদের খোঁজ না মেলায় প্রথমে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে স্থানীয়দের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মেথিকান্দা স্টেশনসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় স্টেশনমাস্টারের করা মামলায় ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে নিহত নারীর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। শনিবার দুই স্বজন তার কবর জিয়ারত করেছেন। পরিবারের আরও সদস্য রোববার সেখানে যাবেন।
সময়ের আলো/এসএকে