ড্রেনের ভেতর স্তূপ হয়ে আছে পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেটজাত পণ্যের পরিত্যক্ত ফয়েল ও ককশিটের টুকরো। এই বর্জ্যেই বন্ধ হয়ে আছে গাইবান্ধা পৌর শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে- সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যাচ্ছে হাঁটুপানিতে, ঘরের আঙিনায় ঢুকে পড়ছে নোংরা পানি আর শহরজুড়ে তৈরি হচ্ছে দুর্বিষহ জলাবদ্ধতা। এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই পৌরসভা প্রশাসনিক মর্যাদায় সর্বোচ্চ ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হলেও নালা-নর্দমার নিচে জমে থাকা পলিথিনের স্তূপ যেন জানিয়ে দিচ্ছে, নাগরিক সুবিধায় শহরটি এখনো কতটা পিছিয়ে।
গত কয়েক দিনের টানা হালকা ও ভারী বৃষ্টিতে গাইবান্ধা পৌর শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকা তলিয়ে যায়। সরেজমিন দেখা গেছে, পৌর শহরের খাঁ পাড়ায় গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র-মাতৃসদন সড়ক, কাঁচারী বাজার, মধ্যপাড়া ও ভি-এইড রোডসহ শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সৃষ্টি হয় দুর্বিষহ জলাবদ্ধতা। অনেক বাড়ির আঙিনা ছাড়িয়ে পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরেও। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে থাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে পথচারী ও যানবাহনের।
এই দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় শিকার শিক্ষার্থীরা। গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক ডুবে যায় হাঁটুপানিতে। বাধ্য হয়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে ত্বকে চুলকানিসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই সমস্যা নতুন নয়-দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে, তবু স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ফিরে আসে একই দুর্ভোগ।
বর্ষা শুরুর আগে পৌরসভার ড্রেন পরিষ্কারের কাজ শুরু হতেই বেরিয়ে আসে জলাবদ্ধতার আসল কারণ। নালার মুখ থেকে উঠে আসতে থাকে স্তূপ স্তূপ পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতল ও ককশিটের মতো অপচনশীল বর্জ্য। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা শাখা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত থাকলেও এবং নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার জন্য প্রচারণা চালানো হলেও একশ্রেণির বাসিন্দা এখনো সরাসরি নালাতেই ফেলছেন পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্য।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু গাইবান্ধা পৌর শহর নয়, জেলার প্রায় সব উপজেলা শহরেই এখন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য জলাবদ্ধতার বড় কারণ। এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
শুধু পলিথিন-প্লাস্টিকের বর্জ্যই নয়, জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে আরও কিছু গভীর কাঠামোগত কারণ, যা দিনের পর দিন সমস্যাটিকে আরও ঘনীভূত করে তুলছে।
শহর পরিকল্পনাবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, গাইবান্ধা শহরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্কই মূলত গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে-পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ঢাল ও গতিপথ বিবেচনায় না রেখে খণ্ড খণ্ডভাবে ড্রেন নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি নির্বিঘ্নে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহর ও শহরতলির পুকুর, জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার একের পর এক ভরাট করে অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রবণতা। এক সময় যে-সব পুকুর-জলাশয় বৃষ্টির পানি ধারণ করে রাখত, সেগুলোর জায়গায় গড়ে উঠছে বাড়িঘর ও স্থাপনা-ফলে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ধারণ-ক্ষমতাই কমে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে।
এর পাশাপাশি নর্দমার পানি বহনকারী খাল ও কালভার্টগুলোর মুখও দখল ও দূষণের কবলে পড়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ দখলদারি আর যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে এসব পানিপ্রবাহের পথ সরু হয়ে আসছে, কোথাও কোথাও একেবারে রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ না পেয়ে জমে থাকছে সড়কে ও বসতবাড়িতে।
সব মিলিয়ে বিদ্যমান ড্রেনগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বছরের একটা লম্বা সময় ড্রেন পরিষ্কারের কার্যক্রম না থাকায় পলি, বর্জ্য ও আবর্জনা জমে ড্রেনের ধারণক্ষমতা কমে আসে আর বর্ষা মৌসুম এলে তারই মাশুল দিতে হয় পুরো শহরকে।
শুধু বর্জ্যই নয়, প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগও কম নয়। সচেতন নাগরিকদের অনেকেই জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করছেন পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে। তাদের অভিযোগ, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবছর শত কোটি টাকার বাজেট থাকলেও পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয় ড্রেন নির্মাণ ও বিদ্যমান ড্রেনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অনেক এলাকায় ড্রেন থাকলেও তা অপরিষ্কার ও অকার্যকর হয়ে পড়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু হানিফ স্বীকার করেন, শহরের নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, পানিনিষ্কাশনের জন্য নালাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করার চেষ্টা চলছে এবং নতুন অর্থবছরের একটি প্রকল্পে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নকাজ হলে সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গাইবান্ধা পৌরসভা দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে। ১৯২৩ সালের ১ অক্টোবর ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি উন্নীত হয় ‘খ’ শ্রেণিতে। এরপর ২০০২ সালের ১৫ মে সর্বোচ্চ ‘ক’ শ্রেণির মর্যাদা অর্জন করে গাইবান্ধা পৌরসভা, যা এর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
জেলা সদরে অবস্থিত এই পৌরসভার আওতায় রয়েছে মোট ১০টি মৌজা এবং মোট আয়তন ১০ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে পৌরসভাটির কার্যক্রম, যার প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন একজন প্রশাসক এবং পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন আটজন সদস্য। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি।
নাগরিক অবকাঠামোর দিক থেকে দেখা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় পৌরসভায় রয়েছে পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা মিলিয়ে মোট প্রায় ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ড্রেন নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে মোট ড্রেনের প্রায় ৪০ শতাংশই এখনো কাঁচা বা আধাপাকা অবস্থায় রয়ে গেছে- যা বর্ষা মৌসুমে দ্রুত পানি নিষ্কাশনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জলাবদ্ধতা নিরসন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদেরা কয়েকটি পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। সবার আগে প্রয়োজন যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা- পলিথিন, চিপসের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের বোতল যেন নির্দিষ্ট স্থান বা ডাস্টবিনেই ফেলা হয় এবং কোনোভাবেই তা ড্রেন-নর্দমায় না ফেলা হয়। পাশাপাশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে কাপড়ের ব্যাগ বা অন্যান্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
এর পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে সারা বছরই নালা-নর্দমা সচল থাকে, কেবল বর্ষা এলে নয়। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতন হওয়া এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সচেতন করার বিষয়টিকেও তারা সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। অবকাঠামোগত দিক থেকে পৌরসভার অবশিষ্ট কাঁচা ও আধাপাকা ড্রেনগুলো ধারাবাহিকভাবে পাকা করার সুপারিশও উঠে আসছে, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ে।
এ প্রসঙ্গে নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগ গাইবান্ধার সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা নয়, এ থেকে পরিত্রাণ এখন পৌরবাসীর নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, শহরের সামগ্রিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষার ভিত্তিতে নতুন করে সাজানো প্রয়োজন, পাশাপাশি অবশিষ্ট পুকুর ও জলাশয়গুলো রক্ষায় পৌরসভাকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, নইলে ভবিষ্যতে পানি ধরে রাখার আর কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকবে না।
পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল মনে করেন, দখল-দূষণে বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল ও কালভার্টগুলো উদ্ধার করে সচল রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। তিনি বলেন, শুধু নাগরিক সচেতনতা দিয়ে এই সংকট মিটবে না, প্রয়োজন পৌরসভা, প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যাতে প্রতিবছর বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে না আসে।
জলাবদ্ধতার বর্তমান পরিস্থিতি বা বর্জ্য অপসারণ নিয়ে সহায়তার প্রয়োজন হলে স্থানীয় পৌরসভার শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় স্থানীয় কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রচারণা বা মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর নজরদারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নইলে শতবর্ষী এই পৌরসভা প্রশাসনিক মর্যাদায় যত এগোবে, প্রতি বর্ষায় এর নাগরিকদের ততটাই ভুগতে হবে হাঁটুপানির দুর্ভোগে। গাইবান্ধা পৌর পরিষদের কাছে তাই পৌরবাসীর প্রত্যাশা- দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি এই মৌলিক সংকট সমাধানেও যেন সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সময়ের আলো/জো