শত প্রতিবন্ধকতাও দমাতে পারেনি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) শিশু লামিয়া আক্তার মাইশাকে। সব প্রতিকূলতা জয় করে সাধারণ কোটায় প্রাথমিক বৃত্তি পাওয়ায় এখন তৃপ্তির হাসি মাইশার দরিদ্র পরিবারে। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১২৩ নম্বর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই গৌরবময় সাফল্য অর্জন করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিয়াজ খলিফার চার সদস্যের অভাবের সংসারে জন্ম মাইশার। জন্ম থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও বাকপ্রতিবন্ধি। একসময় যা ছিল বাবা-মায়ের চরম দুশ্চিন্তার কারণ, চিকিৎসা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে তা আজ সাফল্যে রূপ নিয়েছে। চিকিৎসা করানোর পর মাইশা এখন নিজের পায়ে কোনোমতে হাঁটতে পারে। ছয় বছর বয়সে স্কুলে ভর্তির পর থেকে মা মাহিমা আক্তারের সহযোগিতায় প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করত সে। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসেই মাইশা মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় খুব অল্প সময়েই সে শিক্ষকদের স্নেহভাজন এবং সহপাঠীদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় দারিদ্র্যের কারণে মাইশার বাবা-মা তাকে পরীক্ষা দেওয়ানোর বিষয়ে অনিহা প্রকাশ করেছিলেন। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেহেনা পারভীন রিয়ার বিশেষ অনুপ্রেরণায় মাইশা পরীক্ষায় অংশ নেয়। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, সাধারণ কোটায় বৃত্তি লাভ করেছে সে।
মাইশার বাবা রিয়াজ খলিফা ও মা মাহিমা আক্তার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে প্রাইভেট পড়িয়ে সন্তানকে লেখা পড়া করানো সম্ভব ছিল না। শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকের অনুপ্রেরণা ও সাহসে বিনা মূল্যে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাওয়ায় মাইশা আজ বৃত্তি পেয়েছে। বসতভিটাটুকুই আমাদের একমাত্র সম্বল, দৈনিক আয় দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তারপরও আমাদের দুই মেয়ে যতদূর পড়াশোনা করতে চায়, আমরা কষ্ট করে হলেও করাব। ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে একটি সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন দেখছে মাইশা।
১২৩ নম্বর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেহেনা পারভীন বলেন, আমাদের বিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় ২২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১০ জন ট্যালেন্টপুলে এবং মাইশাসহ ৫ জন সাধারণ কোটায় বৃত্তি পেয়েছে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন একজন শিক্ষার্থীর এই সাফল্যে আমরা শিক্ষকরা অত্যন্ত গর্বিত।
এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাবিবুল্লাহ বলেন, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার মাইশার বৃত্তি পাওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা তার খোঁজখবর নিয়েছি। সে পড়াশোনা করে জীবনে বড় হতে চায়। তার এই ইচ্ছা পূরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কমিটিতেও উত্থাপন করা হবে যাতে মাইশার ভবিষ্যৎ শিক্ষা পথ সুগম হয়।
সময়ের আলো/জোই