চারদিকে শুধু বানের পানি। দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বন্যাকবলিত কামারচাক ইউনিয়নের কড়াইয়া হাওড়পাড়ের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের কামাল মুন্সিবাড়ির ১১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।
পানিবন্দি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা হলেন- কামাল মুন্সি, ফখরুল মিয়া, সোহান মিয়া, সুফি বেগম, শারমিন বেগম, জগলু মিয়া, ফাইজা বেগম, সাজক মিয়া, আনিকা, লাউল মিয়া ও আকবর আলী।
চারদিকে থইথই পানি আর চলাচলের সব পথ বন্ধ। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। পর্যাপ্ত ত্রাণ ও সহায়তা তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো বেশ কঠিন। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে।
খবর পেয়ে সোমবার (১৩ জুলাই) বিকালে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তাদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই আমরা খোঁজ নিয়েছি। আমাদের পক্ষ থেকে সহায়তা বরাদ্দ পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান বলেন, ১১ জনের মধ্যে ৮ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। বাকি তিনজন আবেদন না করায় এখনও ভাতার আওতায় আসেননি। আবেদন করলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি কোনো বিশেষ সহায়তা বরাদ্দ এলে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা করা হবে।
সরেজমিন দেখা যায়, টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা লাগাটা নদীর ঢলে সৃষ্ট বন্যায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষগুলোর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তাদের বাড়ির চারপাশ পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর আশ্রয় নিয়ে থাকা মানুষগুলোর নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। ফলে তারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আলাপকালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফি বেগম বলেন, আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চারদিকে পানি থাকায় কোনো কাজ করতে পারছি না। আগে মানুষের বাড়িতে গিয়ে কাজ করে কিছু সাহায্য পেতাম। কিন্তু বন্যার পর থেকে কেউ আমাদের কাছে আসতে পারে না, আমরাও কোথাও যেতে পারি না। একবেলা খেতে পারলে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হয়।
বাড়ির প্রবীণ নারী কবিতুন বেগম বলেন, এই বাড়িতে অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ বসবাস করে। বন্যার কারণে তারা চরম কষ্টে আছে। তাদের প্রতি যদি কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তা হলে অনেক উপকার হবে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কামাল মুন্সি বলেন, জন্ম থেকেই আমরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আমাদের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসবে না। এরপর থেকে আর কোনো চিকিৎসাও করানো হয়নি।
স্থানীয় সমাজসেবক সুমন আহমদ বলেন, বন্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাদের কাছে সহজে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে ১১ জনের মধ্যে ৮ জন নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক সামাজিক সংগঠন সেখানে পৌঁছাতে পারছে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি