প্রকল্পের হাজার কোটি টাকা জলে

চট্টগ্রাম ব্যুরো

সারাদেশ

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে কোনোভাবে রেহাই মিলছে না। বৃষ্টি শুরু হলে সয়লাব হয় নিচু এলাকা। ঢাকঢোল পিটিয়ে বছরজুড়ে চলে জলাবদ্ধতা

2026-07-15T01:17:42+00:00
2026-07-15T01:21:54+00:00
 
  বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা
প্রকল্পের হাজার কোটি টাকা জলে
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১:১৭ এএম  আপডেট: ১৫.০৭.২০২৬ ১:২১ এএম
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা। সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে কোনোভাবে রেহাই মিলছে না। বৃষ্টি শুরু হলে সয়লাব হয় নিচু এলাকা। ঢাকঢোল পিটিয়ে বছরজুড়ে চলে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সুফলের কথা। বর্ষা এলে কোমরপানিতে ডুবে যায় নিচু এলাকা। তখন দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কর্মকর্তাদের। কিন্তু দুর্ভোগে ক্ষুব্ধ নগরবাসীর ক্ষোভ কোনোভাবে কমে না। 

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলছে প্রায় এক দশক ধরে। একবার বলা হয় প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রতিবার আশ্বাস দেওয়া হয় আসন্ন বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যাবে না নিচু এলাকা। কিন্তু টানা বৃষ্টি শুরু হলে মুহূর্তে পাল্টে যায় নগরীর চিত্র। হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে ডুবে যায় নগরীর অর্ধেকের বেশি অংশ। চলমান প্রকল্পের ১৪ হাজার কোটি টাকার জলেই গেছে এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। 

চট্টগ্রামে চলতি জুলাই মাসে ৪২ বছরের মধ্যে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে নগরীর নিচু এলাকার বড় অংশ ডুবে যায়। গেল ছয়দিন ধরে টানা ডুবে ছিল নগরীর প্রায় সব নিচু এলাকা। এর মধ্যে বাকলিয়া, চকবাজার, ষোলশহর, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, বাদুড়তরতলা, প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেটসহ বিশাল এলাকা। 

জলাবদ্ধতার কারণ নিয়ে আছে নানা মতামত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। চট্টগ্রাম নগরীর চারদিকে কর্ণফুলী নদী। নগরীর একটি অংশ আবার সমুদ্র তীরে। ভারী বৃষ্টি হলে কর্ণফুলী নদীর পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। এই নদীর সঙ্গে যুক্ত নগরীর খালগুলো উপচে পড়ে। এরপর নগরীর নিচু এলাকা তলিয়ে যায়। 

তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও নদী দখল চলছে। পাশাপাশি চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পাহাড় কাটা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবেই সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলছে না। 

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এই সংকট বহু পুরোনো। সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা আছে। সেই সঙ্গে নগরবাসীর উদাসীনতা এবং অবেহলাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। তারা পানি প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম খালকে বর্জ্যরে ভাগাড় মনে করে। নির্বিচার বর্জ্য ফেলা হয় সেখানে। আবার খালগুলো বেদখল হয়ে আছে বছরের পর বছর। বৃষ্টি হলে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা যায় না। এতে খালের পানি উপচে পড়ে সয়লাব হয় নিচু এলাকা। 

তিনি বলেন, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ চাক্তাই খাল দখলের কারণে প্রশস্ততা কমে গেছে। এই খালেই একসময় নৌ-বাণিজ্য হতো। খালটির প্রশস্ততা কমে গেছে। এ জন্য পানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে না। ফলে নগরীতে বৃষ্টির সময় উপচেপড়ে পানি।
একজন নগ পরিকল্পনাবিদ বলেন, খালগুলোতে ব্যাপক হারে বর্জ্য জমছে। 

কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই নগরবাসী প্লাস্টিক, পলিথিন, কর্কশিট থেকে খাট, আলনা, লেপ-তোশক সবই ফেলছে। এতে খালগুলো ভরাট হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্প কাজ চলমান থাকায় খালের পরিধি বড় হয়েছে। কিন্তু নগরবাসীর বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়নি। এতে বৃষ্টি হলে খালের পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। নগরীর নিচু এলাকা তলিয়ে যায়। জনগণ চরম দুর্ভোগে পড়েন। 

চসিকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রতিদিন বিপুল বর্জ্য তৈরি হয়। পরিমাণে তা তিন হাজার টনের কম হবে না। চসিক দুই হাজার টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে পারে। অর্থাৎ বর্জ্য সরাতে পারে। বাকি এক হাজার টন বর্জ্য প্রতিনিয়ত খাল নালা নর্দমায় পড়ে থাকে। এগুলো নিয়মিত অপসারণ না করায় জলাবদ্ধতার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। 
জলাবদ্ধতার জন্য নির্বিচার পাহাড় কাটাও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান। 

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো অন্য জেলার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। এসব পাহাড় বালুর পাহাড়। পাহাড়গুলো নির্বিচার কাটা হচ্ছে। বৃষ্টির সঙ্গে, পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে সব বালি ড্রেনে এসে জমছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। পাহাড় কাটা বন্ধ হলে এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ হলে কমবে জলাবদ্ধতা।

১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতি বছর তলিয়ে যাচ্ছে। যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এতে ১৪ হাজার কোটি টাকার জলবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে এই টাকা জলেই গেছে। না হয় প্রতি বছর বারবার চট্টগ্রাম নগরী ডুববে কেন। সিডিএ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরীতে ২০১৭ সালে শুরু জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ। প্রায় এক দশক ধরে চলছে কাজ। পৃথকভাবে হচ্ছে প্রকল্পের কাজ। 


এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) দুটি, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি করে মোট চারটি প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। এরই মধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে কোমর ও বুকসমান পানিতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে নগরীর লাখো বাসিন্দা। 

চলতি বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাফল্য তুলে ধরেছিলেন। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বারবার বলেছেন এবার জলাবদ্ধ হবে না নগরী। কিন্তু চলতি সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিতে মেয়রের প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা হয়নি। জলে হাবডুবু খেয়েছেন নগরবাসী। এবারের দুর্ভোগ ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   প্রকল্প  হাজার কোটি  টাকা  চট্টগ্রাম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: