জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ও ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর অন্যতম মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদির প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ নিয়ে চলমান বিতর্ক ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান চান তার পরিবার। সংগঠনের উত্তরাধিকার ও পরিচালনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার ও গুজবের মধ্যে সবাইকে শান্ত থাকার এবং আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন শহিদ হাদির বোন মাসুমা হাদি।
সম্প্রতি নলছিটি শহরের একটি বাসায় দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই আহ্বান জানান।
কয়েক দিন আগে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল জাবের ও সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ ছয়জন দায়িত্বশীল সদস্য পদত্যাগ করার পর সংগঠনটির ভবিষ্যৎ ও এর উত্তরাধিকার নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন তৈরি হয়।
কারো সাথে আলোচনা না করেই পদত্যাগ কেন?
পদত্যাগের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে মাসুমা হাদি বলেন, আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। সে আমাকে জানিয়েছে যে পদত্যাগকারীদের সঙ্গে তার কোনো আলোচনা বা কথা হয়নি। তাহলে তারা কার সঙ্গে আলোচনা করে পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত নিলেন? আমরা নাকি উত্তরাধিকার দাবি করছি— এমন মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। কার কাছে আমরা উত্তরাধিকার দাবি করেছি, তার প্রমাণ দিন।
তিনি আরও বলেন, ওরা (জাবের ও জুমা) যদি সংগঠন থেকে বেরিয়েই যায়, তবে ওসমান হাদির আমানত কার কাছে হস্তান্তর করল? দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন দায়িত্বহীন আচরণ কাম্য নয়। ভাইয়ের ভালোবাসার নামে ওনাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না।
হাদির স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক দূরত্বের গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে মাসুমা হাদি বলেন, আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত অটুট। গত কোরবানির ঈদেও হাদির স্ত্রী ও সন্তান নলছিটিতে আমাদের বাড়িতেই ছিল। আমাদের কোনো লোভ নেই, আমরা ভাই-বোনেরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। যারা আমাদের পরিবারের মধ্যে ফাটল ধরাতে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, তাদের এই অপতৎপরতা বন্ধ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
গত জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে মাসুমা হাদি বলেন, এখন জুলাই মাস চলছে। এই জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির যোদ্ধা ছিলেন আমার ভাই ওসমান হাদি। আর এই কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারত ও বাংলাদেশের অপরাজনীতি জড়িত।
বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমাদের একমাত্র দাবি— দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতে আটক শুটার ফয়সাল ও আলমগীরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে জবানবন্দি রেকর্ড করে বিচার শুরু করা হোক। তাহলেই এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কুশীলবদের নাম বেরিয়ে আসবে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই জুলাই মাসে যেখানে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে আমাদের সোচ্চার হওয়ার কথা, সেখানে আমরা কালচারাল সেন্টার নিয়ে বিতর্কে জড়াচ্ছি। আমি একা হলেও রাজপথে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের হত্যার বিচার দাবি করে যাব। প্রয়োজনে আবারও শাহবাগে আন্দোলনের ডাক দেব।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন অকুতোভয় তরুণ ওসমান হাদি। দেশে ‘ইনসাফভিত্তিক’ রাজনীতি কায়েম এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারতীয় আগ্রাসনমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় নামেন তিনি। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কি এলাকার বক্স কালভার্ট রোডে প্রচারণা চালানোর সময় বন্দুকধারীদের অতর্কিত হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থা তিনি মারা যান।
সময়ের আলো/জোই