রাস্তার মাঝখানে বসে আছেন বাঁচা মিয়া আর তার স্ত্রী। সামনে ছড়িয়ে আছে অঙ্কুর গজানো ভেজা ধান- যা একসময় ছিল তাদের সারা বছরের সম্বল। মাটির বাড়িটা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দুই কিলোমিটার দূরে শ্বশুরবাড়ি থেকে আনা ভাত-তরকারি খাচ্ছেন রাস্তার ধারে বসে। পাঁচ দিন ধরে শুধু কলা আর মুড়ি খেয়ে টিকে আছেন।
বাঁচা মিয়ার বয়স ৪৮। বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাগমারা গ্রামে তার পাঁচ সন্তান নিয়ে সংসার। তিন মেয়ে বিবাহিত। কৃষিই একমাত্র জীবিকা।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে পশ্চিম বাগমারা গ্রামে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বিলাপ করে বললেন, অবাজি, সম্বল বলতে আছিল দে ২৬০ আরি ধান। বেয়াগ্গিন ভিজি বুরি শেষ অয় গেইয়ে। (বাবা, শেষ সম্বল ছিল ২৬০ আড়ি ধান। বন্যার পানিতে ভিজে সব শেষ হয়ে গেছে)।
ধানের গোলাটা মাটির তৈরি। বন্যার পানিতে গোড়া ভিজে গেছে, যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। ভেতরে ধান আটকে আছে, কিন্তু আতঙ্কে সেখানে ঢোকার সাহস নেই। তাই ভেজা ধান নিয়ে চাতালে এসেছেন রোদে শুকাতে। তবু যদি কিছুটা বাঁচে।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ দক্ষিণ চট্টগ্রামকে দ্রুত বন্যাকবলিত করে তোলে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে বাঁশখালীতে। ৬ জুলাই থেকে বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথরিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত।
বাঁচা মিয়ার মতো এই উপজেলায় হাজারো পরিবার একই অবস্থায়। মাটির ঘর গেছে, ধান গেছে, আসবাব গেছে। যা ছিল, সব বন্যার পানি গ্রাস করে নিয়েছে। ‘শুধু কলা-মুরি হাইয়েরে ৫ দিন থাক্কি’- বাঁচা মিয়ার এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে বাঁশখালীর হাজারো মানুষের পাঁচটি দিনের গল্প।
বন্যার পানি এখন ধীরে ধীরে নামছে। কিন্তু ক্ষতির যে হিসাব উঠে আসছে, তা শুধু সংখ্যায় মাপা যাচ্ছে না। একজন কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম, তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আরও দুই সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন-সব কিছু ভেসে গেছে একটি বন্যায়।
রাস্তার চাতালে রোদে শুকানো ধানের দিকে তাকিয়ে বাঁচা মিয়া বললেন কিছু না। শুধু আকাশের দিকে একবার তাকালেন।
সময়ের আলো/জোই