একদিকে বাড়ির উঠোনে মায়ের নিথর দেহ, অন্যদিকে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে জীবনের একমাত্র সম্বল— এমনই এক চরম হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হলো বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের লেমুয়া বাজার। একই রাতে মাকে হারানোর শোক আর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারানোর বেদনা স্তব্ধ করে দিয়েছে ৩০ বছর বয়সী সুরমা বেগমকে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাত বছর আগে সুরমার বাবা আলমগীর হাওলাদার মারা যান। এরপর ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়েই সংসারের হাল ধরেন সুরমা। সেই দোকানটিই ছিল তার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এবং বেঁচে থাকার মূল অবলম্বন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সুরমার মা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘরে তখন শোকের মাতম। মায়ের মরদেহ বাড়ির উঠোনে রেখে স্বজনেরা যখন দাফন-কাফনের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আসে দ্বিতীয় আঘাতটি।
সোমবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে লেমুয়া বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এবং একের পর এক দোকান দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।
এ সময় পরিচিতজনদের ফোনে সুরমা জানতে পারেন যে তার চায়ের দোকানেও আগুন লেগেছে। কিন্তু মায়ের মরদেহ রেখে মাঝরাতে ঘটনাস্থলে যাওয়ার মতো মানসিক ও শারীরিক অবস্থা তার ছিল না। মায়ের দাফন শেষে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পুড়ে যাওয়া নিজের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন, ‘মায়ের মরদেহ রেখে কেমনে এখানে আসি?’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, এই অগ্নিকাণ্ডে মুদি, মনোহরি, ফার্মেসি, পোশাক ও জুতার দোকানসহ অন্তত ৪৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাথরঘাটা, মঠবাড়িয়া ও বামনা স্টেশনের তিনটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই অধিকাংশ দোকান পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শন করেন বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার, পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা এবং পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো লেমুয়া বাজারজুড়ে পোড়া গন্ধ ও ধ্বংসস্তূপ। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহাজারিতে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ ছাইয়ের স্তূপে অবশিষ্ট মালামাল খুঁজছেন, আবার কেউ সর্বস্ব হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন।
জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা সম্পন্ন হলে দ্রুত সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই