বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন রহমতের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি অতিবৃষ্টি ও বন্যা অনেক সময় তা দুর্ভোগে পরিণত করে। চলমান বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বহু এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সংকট- সাপের উপদ্রব। বন্যার পানিতে সাপের গর্ত ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ডুবে গেলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা, বিদ্যালয়, আশ্রয়কেন্দ্র- এমনকি বিছানার নিচেও আশ্রয় নিতে পারে।
ফলে অসতর্কতার কারণে সাপের দংশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় নয়, সচেতনতা, সঠিক জ্ঞান এবং দ্রুত চিকিৎসাই হতে পারে জীবন রক্ষার সর্বোত্তম উপায়।
ইসলাম মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৩২)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫)। যদিও এই আয়াতের মূল প্রসঙ্গ আল্লাহর পথে ব্যয়, তবু এর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে না ফেলা ইসলামের একটি সাধারণ নীতি। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৭১)।
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা ঈমানদারের কর্তব্য। চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি নবীজি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসাও সৃষ্টি করেছেন’ (সুনানু আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫)।
এই হাদিস স্পষ্ট করে যে, দুর্ঘটনা বা রোগব্যাধির ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং ইসলামের নির্দেশনা। সাপে দংশনের পর অনেকেই ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে, দংশনের অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। বিষ চুষে বের করা, ক্ষত কেটে রক্ত বের করা বা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধার মতো ভুল পদ্ধতি পরিহার করতে হবে।
প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা। বন্যার সময় কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে। রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করা, খালি পায়ে না হাঁটা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জুতা ও কাপড় ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করা, মেঝেতে না শুয়ে উঁচু খাটে ঘুমানো এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা সমর্থন করে না। সাপ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ। তবে নিরাপদভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই উত্তম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপেরও একটি ভূমিকা রয়েছে, কারণ তারা ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাপ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি, বনাঞ্চলসংলগ্ন ও জলাবদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এ সচেতনতা আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ সামান্য অবহেলা একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বন্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ধৈর্য, দোয়া, সতর্কতা এবং যথাযথ ব্যবস্থা- সবকিছুরই প্রয়োজন। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি জীবন রক্ষার সব বৈধ উপায় অবলম্বন করতে হবে। তাই বন্যার এই সময়ে গুজব বা কুসংস্কারে নয়, বরং কুরআনের নির্দেশনা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমন্বিত অনুসরণই আমাদের নিরাপত্তার সর্বোত্তম পথ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বন্যাসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাপের উপদ্রব এবং সব বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/আআ