বাগেরহাটের ফকিরহাটে এক ভিন্নধর্মী হস্তশিল্পের নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন অরুণ পাল ও তার পরিবার। মেহগনি কাঠের ছোট টুকরো আর বাটালির নিখুঁত কারুকাজে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ও লোকজ সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ—‘কাঠের কলম’। নান্দনিক এই সৃষ্টি দিয়ে তারা এখন দেশজুড়ে আলোচনায়।
মাসকাটা গ্রামের অরুণ পাল ও তার তিন ভাইয়ের হাত ধরে গড়ে উঠেছে ‘মিথুন কুটির শিল্প’। তবে এই শিল্পের পেছনের গল্পটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সংগ্রামের। উদ্যোক্তা অরুণ পাল বলেন, আমরা কৃষক পরিবারের সন্তান। বাইরে অন্য কোনো কাজ করার চেয়ে নিজেদের ঘরেই সৃজনশীল কিছু করার লক্ষ্য থেকে এই যাত্রা শুরু করি। শুরুতে বাঁশ দিয়ে কাজ করলেও, গত ২০ বছর ধরে আমরা মেহগনি কাঠ দিয়ে কলম তৈরি করছি।
এই শিল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, কলম তৈরির মেশিনটি তাদের নিজেদেরই আবিষ্কার। অরুণ পাল গর্বের সঙ্গে জানান, পুরো বাংলাদেশে তারা তিন ভাই ছাড়া কাঠের কলম তৈরির এই নিজস্ব প্রযুক্তি আর কারও কাছে নেই।
একটি কাঠের কলম তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিপুণ ও সময়সাপেক্ষ। প্রতিটি কলম চূড়ান্ত রূপ পেতে ৩৬টি ভিন্ন ভিন্ন ধাপ পার করতে হয়। প্রতিটি ধাপে অন্তত একবার করে, অর্থাৎ একটি কলম তৈরিতে মোট ৩৬ বার হাতের ছোঁয়া লাগে। নিজেদের উদ্ভাবিত মেশিনে পুরো পরিবার মিলে মাসে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার কলম উৎপাদন করছেন।
নিপুণ কারুকাজে তৈরি এই কলমের কদর এখন দেশজুড়ে'আড়ং। ‘আড়ং’-এর মতো নামি ব্র্যান্ডসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম নিয়মিত তাদের কাছ থেকে কলম সংগ্রহ করছে। বর্তমানে নকশাবিহীন সাধারণ কলম ৩১ টাকা এবং নকশা করা কলম ৬৫ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ফকিরহাটের এই ব্যতিক্রমী শিল্পকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে চান এই কারিগরেরা। অরুণ পালের প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণসহায়তা পেলে এই শিল্পকে আরও আধুনিকায়ন করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি উদ্যোগে এই পরিবেশবান্ধব শিল্পকে সহযোগিতা করলে একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা যাবে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড হিসেবে এই কলম রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফকিরহাটের তিন ভাইয়ের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ বিশ্ব দরবারে দেশের হস্তশিল্পের মানচিত্রকে আরও উজ্জ্বল করবে— এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
সময়ের আলো/জোই