গল্পটা মেসির একার নয়, আর্জেন্টিনার

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

একসময় আর্জেন্টিনা মানেই ছিল মেসি। দল জিতলেও মেসি, দল হারলেও তার দায় গিয়ে পড়ত সেই মেসির কাঁধে। সেসময় আর্জেন্টিনা মাঠে

2026-07-17T01:22:00+00:00
2026-07-17T02:12:49+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
খেলা
গল্পটা মেসির একার নয়, আর্জেন্টিনার
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১:২২ এএম  আপডেট: ১৭.০৭.২০২৬ ২:১২ এএম
ছবি : সংগৃহীত
একসময় আর্জেন্টিনা মানেই ছিল মেসি। দল জিতলেও মেসি, দল হারলেও তার দায় গিয়ে পড়ত সেই মেসির কাঁধে। সেসময় আর্জেন্টিনা মাঠে নামলেই সবার চোখ থাকত মেসির দিকে। মেসি কী করবেন, সেটাই যেন নির্ধারণ করত ম্যাচের ভাগ্য। কিন্তু সময় বদলেছে, আগের নির্ভরতার গল্প এখন আর নেই। মেসি দলের সেরা তারকা হলেও ম্যাচ জেতানোর দায়িত্ব ভাগ হয়ে গেছে সবার মধ্যে। আজকের আর্জেন্টিনা আর একক মেসি নয়; এটি এক দল, যেখানে মেসি নেতা আর জয়ের নায়ক পুরো দল।
 
২০১০ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে আর্জেন্টিনার দলের আক্রমণে ছিলেন মেসি। দলে ডি মারিয়া, কার্লোস তেভেজ, গঞ্জালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরোদের মতো তারকা থাকলেও প্রতিপক্ষের পরিকল্পনায় ছিল সেই একজনকে ঘিরেই। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানি সেই মেসিকে থামানোর পরিকল্পনায় সফল হয়। মেসি তার স্বাভাবিক স্বভাব না রাখতে পারায় ম্যাচও হেরে যায় ৪-০ ব্যবধানে। 

চার বছর পর ব্রাজিল বিশ্বকাপ। মেসি যেন দলকে একাই টেনে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। গ্রুপপর্ব থেকে শুরু করে নকআউট ম্যাচ। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একের পর এক ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স। সবকিছুতেই তিনি ছিলেন দলের বড় ভরসা। কিন্তু ফাইনালে মেসির জন্য জার্মানি আলাদা পরিকল্পনা সাজায়। তাকে যতটা স্পেস কম দেওয়া যায়, বল থেকে যতটা দূরে রাখা যায়। মেসি নিজের সেরাটা দিতে না পারলে, আর্জেন্টিনা গোলও পায়নি। অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে গোল হজম করে ভেঙে যায় শিরোপার স্বপ্নও। 

রাশিয়া বিশ্বকাপে সেই ভরসা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেবার বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পাড়ি দিতে পারবে কি না সেটা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল। সেবারও ত্রাতা সেই ১০ নম্বরের মেসিই। বলিবিয়ার বিপক্ষে বাছাইপর্বের শেষ-ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে কোনোমতে দলকে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা এনে দেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ জানত, মেসিকে আটকে দিতে পারলেই আর্জেন্টিনার অর্ধেক শক্তি নিঃশেষ। সেই কারণেই পুরো দলের পরিবর্তে একজনকে থামানোর পরিকল্পনাই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ তে হার, আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির পেনাল্টি মিসে ১-১ গোলে ড্র আর শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ মেসি ম্যাজিকে গ্রুপপর্ব পাড়ি দেয় আর্জেন্টিনা। শেষ-ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হারের তীব্র সমালোচনা ছুটে আসে তার দিকেই।  অথচ সমস্যাটা ছিল পুরো দলের ভারসাম্যে, যা বছরের পর বছর ধরে একজনের কাঁধে অতিরিক্ত দায় চাপিয়ে রেখেছিল।  

বারবার একই গল্পের পুনরাবৃত্তির পরই আর্জেন্টিনা বুঝতে পারে, শুধু বিশ্বের সেরা ফুটবলার থাকলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না; তার চারপাশে গড়ে তুলতে হয় একটি পূর্ণাঙ্গ দল। আর সেখান থেকেই শুরু হয় বদলের গল্প। লিওনেল স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল দলের সংস্কৃতিতে। ড্রেসিংরুমে সিনিয়র-জুনিয়রের দূরত্ব কমে যায়, সবাই একই লক্ষ্য নিয়ে খেলতে শুরু করে। সেই পরিবর্তনের প্রথম বড় পুরস্কার আসে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায়। ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছর পর মেজর ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। সেই টুর্নামেন্টের কেন্দ্রে মেসি থাকলেও সাফল্যের ভিত্তি ছিল দলগত। 

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেই ধারণা আরও পরিণত রূপ পায়। মেসি ছিলেন দলের নেতা এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, কিন্তু প্রতিটি নকআউট ম্যাচে উঠে এসেছে নতুন নায়ক। কোথাও আলভারেজের দৌড়, দি মারিয়ার অনবদ্য গোল স্কোরিং, কোথাও ম্যাক অ্যালিস্টারের সৃজনশীলতা, কোথাও এনজো ফার্নান্দেজের নিয়ন্ত্রণ, আবার টাইব্রেকারে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অবিশ্বাস্য সেভ। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ জয় ছিল ১১ জনের সম্মিলিত অর্জন।

এই পরিবর্তনই আর্জেন্টিনাকে শুধু চ্যাম্পিয়ন বানায়নি বরং এমন একটি দলে পরিণত করেছে, যারা মেসি থাকলেও জিততে পারে, আবার মেসি আলোচনার কেন্দ্রে না থাকলেও নিজেদের ফুটবল দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই নতুন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি নতুন নায়কদের উত্থান। জুলিয়ান আলভারেজের গোল, এনজো ফার্নান্দেজের মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ, রদ্রিগো ডি পলের নিরলস পরিশ্রম, এমিলিয়ানো মার্তিনেজের বিশ্বস্ত গোলকিপিং এবং লাওতারো মার্টিনেজের গুরুত্বপূর্ণ গোল। সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা এখন আর একজনের নয়, পুরো দলের শক্তিতে এগিয়ে চলে। মেসি গোল না করলেও ম্যাচ জিতছে। অন্যরা গোল বা সহায়তা করে দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ জেতাচ্ছে। 

মেসির ভূমিকাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন তিনি শুধু গোল করার নায়ক নন; খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন, তরুণদের আত্মবিশ্বাস জোগান এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। একক নায়ক থেকে সত্যিকারের অধিনায়ক হয়ে ওঠার এই রূপান্তরই আজকের আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। হয়তো এই পরিবর্তনই মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন পুরো দলের ভরসা। আর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি গড়ে তুলেছেন এমন এক আর্জেন্টিনা, যেখানে একজন নয়, ১১ জন মিলে জয়ের গল্প লেখে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মেসি  আর্জেন্টিনা  বিশ্বকাপ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: