ফুটবল বিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে এক জাদুকরের পায়ে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রেখেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, আর প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী স্পেন। চিরচেনা সেই আকাশী-সাদা জার্সিতে সবার চোখ যার দিকে থাকবে, তিনি আর কেউ নন-লিওনেল মেসি। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়েও এই মহাতারকা আরও একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক রেকর্ডের একেবারে দোরগোড়ায়।
আসন্ন রোববারের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামলেই মেসি স্পর্শ করবেন এক অবিশ্বাস্য কীর্তি। ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর পর ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার গৌরব অর্জন করবেন তিনি।
এতদিন ধরে বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনটি ফাইনাল খেলার একক সিংহাসনটি ছিল কেবল ব্রাজিলিয়ান রাইটব্যাক কাফুর। কাফুর সেই মহাকাব্যিক যাত্রার শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে, ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে। ২৪ বছরের সেই তরুণ তখনও মহাতারকা হয়ে ওঠেননি। ম্যাচের শুরুতে বেঞ্চে বসে থাকলেও প্রথমার্ধেই ডিফেন্ডার জর্জিনহোর ইনজুরি কাফুর জন্য ভাগ্য খুলে দেয়। মাঠে নেমে সুযোগের সৎ ব্যবহার করেন এবং পেনাল্টি শুটআউটে ব্রাজিলের চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী হন।
এরপর ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। কাফু তখন ব্রাজিল দলের অবিসংবাদিত স্তম্ভ। কিন্তু সেবার জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে হেরে রানার্সআপ ট্রফি নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তবে ফুটবল বিধাতা কাফুর জন্য সেরা মুকুটটি তুলে রেখেছিলেন ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে। সেবার অধিনায়ক হিসেবে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জার্মানিকে ২-০ ব্যবধানে হারান এবং পাঁচ তারকা খচিত সেলেসাওদের হয়ে সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন। আর এভাবেই ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার অমর রেকর্ড গড়েন কাফু।
অন্যদিকে, লিওনেল মেসির গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপকথার মতো। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোদের মতো কিংবদন্তিদের পাশে বসে ইতিমধ্যে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, দুই দশক পরও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন মেসি।
তবে মেসির এই বিশ্বজয়ের রাস্তাটা মোটেও মসৃণ ছিল না, ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে জার্মানির বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের সেই ১-০ ব্যবধানের হার ছিল আর্জেন্টিনার জন্য এক বুক ভাঙা বেদনা। সেই কান্নার রাত পেরিয়ে অবশেষে কাতার বিশ্বকাপে (২০২২) ফুটবল বিধাতা যেন মেসির পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকর এক ফাইনাল শেষে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন মেসি।
আর এবার, আগামী ১৯ জুলাই স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। এই ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, ফুটবল ইতিহাসের পাতায় মেসির নাম যে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে, তা বলাই বাহুল্য।
ফুটবলের ইতিহাসে পেলে, রোনালদো নাজারিও কিংবা লোথার ম্যাথাউসের মতো কিংবদন্তিরাও তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে দলের স্কোয়াডে ছিলেন। কিন্তু কাফু এবং মেসির সাথে তাদের একটা বড় পার্থক্য রয়ে গেছে-বয়স বা ইনজুরির কারণে ওই তারকাদের কেউ না কেউ কোনো একটি ফাইনালের মূল ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি। ফলে পূর্ণাঙ্গভাবে মাঠে নেমে তিনটি ফাইনাল খেলার রেকর্ডে কাফুর পাশে কেবল মেসিই নিজের নাম লেখাতে চলেছেন।
মেসি হয়তো তিনটি ফাইনাল খেলার কীর্তি ছুঁয়ে ফেলছেন, তবে কাফুর টানা তিন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার অনন্য রেকর্ডটি কিন্তু এখনো তার নিজের দখলেই রয়ে গেল। এখন অপেক্ষা কেবল রোববারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যেখানে ফুটবল জাদুকর তার ক্যারিয়ারের আরেকটি সোনালী অধ্যায় রচনা করতে নামবেন।
সময়ের আলো/আরবিএন