বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে উত্তর-পূর্ব স্পেনের স্বাধিকারকামী অঞ্চল কাতালুনিয়া যেন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দোলাচলে। মহারণে কার পক্ষে গলা ফাটাবেন বার্সেলোনার মানুষ? লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই স্পেন দলে বার্সা তারকার অভাব নেই; লা মাসিয়ার রক্তে গড়া লামিন ইয়ামালরাই তো এখন স্পেনের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু হৃদয়ের আর এক কোণে যে তীব্র হয়ে বাজছে লিওনেল মেসির নাম। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে স্পেনের মূল কাঠামোর প্রতি কাতালানদের যে দূরত্ব, তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে দাঁড়িয়েছে মেসির প্রতি তাদের অন্ধ আবেগ।
১৩ বছর বয়সে যে কিশোর একবুক স্বপ্ন নিয়ে বার্সেলোনায় পা রেখেছিল, ৩৪ বছর বয়সে যখন সে ক্যাম্প ন্যু ছাড়ে, ততক্ষণে সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ‘ফুটবল ঈশ্বর’ হিসেবে। কাতালুনিয়ার ধূলিকণায় মিশে আছে মেসির ফুটবলীয় শৈশব ও যৌবন। ফলে, একদিকে দেশের গৌরব আর ঘরের ছেলেদের সাফল্য, অন্যদিকে ঘরের ছেলে হয়ে ওঠা ভিনদেশি এক জাদুকরের ক্যারিয়ারের শেষ মুহূর্তের রূপকথা— এই দুইয়ের টানাপোড়েনে এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আজ কাতালুনিয়ার ফুটবল রোমান্টিকরা।
অথচ মুদ্রার ওপিঠে তাকালে দেখা যাবে, এবারের ফাইনালে স্পেনের মূল শক্তির আসল মেরুদণ্ডটাই কিন্তু বার্সেলোনা! লা রোহাদের স্কোয়াডে থাকা কাতালান ক্লাবের আট-আটজন ফুটবলার— জোয়ান গার্সিয়া, এরিক গার্সিয়া, পাউ কুবারসি, পেদ্রি, গাভি, দানি ওলমো, ফেরান তোরেস এবং বর্তমান বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় লামিন ইয়ামাল। এমনকি সদ্য রিয়াল মাদ্রিদের যোগ দেওয়া একমাত্র ফুটবলার মার্ক কুকুরেয়াও আসলে খাঁটি কাতালান এবং বার্সার বিখ্যাত 'লা মাসিয়া' একাডেমিরই ফসল।
জাতীয় দলে ঘরের ছেলেদের এমন একচেটিয়া আধিপত্য থাকার পরও কিন্তু সাধারণ কাতালানদের ক্ষোভের আগুন নিভে যাচ্ছে না। বার্সেলোনা সমর্থকদের অন্যতম জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘বার্সা ই সিউতাদানিয়া’ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই স্পেনের এই জাতীয় দলকে সমর্থন করবে না। একটি পোস্টারে তারা সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—‘স্পেন কেন এই বিশ্বকাপে হারবে?’
পোস্টের ভেতরের ঝাঁঝালো লেখাটি যেন পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভের এক জ্বলন্ত দলিল, ‘প্রতি চার বছর পর পর বার্সেলোনার আপামর সমর্থকদের মস্তিস্কে ঠিক একই দ্বিধাদ্বন্দ্ব এসে কড়া নাড়ে। স্পেন বিশ্বকাপ জিতুক— এটা চাওয়া কি আদৌ সংগতিপূর্ণ? দলে অনেক বার্সা খেলোয়াড় আছে, শুধু এই অজুহাতে আমরা কি চোখ বন্ধ করে স্পেনের জাতীয় দলকে সমর্থন করতে পারি? যে রাষ্ট্রটি সুশৃঙ্খলভাবে, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কাতালান জাতিকে বছরের পর বছর নিপীড়ন করে আসছে, তাদের রাষ্ট্রীয় দলের জয় কামনা করা কি কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে সম্ভব? ফুটবল আর রাজনীতিকে কি আসলেও এভাবে আলাদা করে ফেলা যায়?’
তবে কাতালানদের এই বিভক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু রাজনীতি নয়, জড়িয়ে আছেন স্বয়ং লিওনেল মেসিও। স্পেনের স্কোয়াডে বার্সেলোনার ঘরের ছেলেদের আধিক্য দেখে কিছু কাতালান যখন ‘লা রোহাদের’ প্রতি কিছুটা নরম হচ্ছেন, তখন স্বাধীনতার পক্ষের কট্টর সমর্থকেরা স্পেনের যেকোনো প্রতিপক্ষকে সমর্থন করার সেই পুরোনো ঐতিহ্যই আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁদের চোখে রবিবারের এই ফাইনাল নিছকই কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং আদ্যোপান্ত এক রাজনৈতিক লড়াই।
আবার এর মাঝেই আছেন মেসি-ভক্তরা, যারা শুধুই ফুটবলের এই খুদে জাদুকরের হাতে শিরোপা দেখার জন্য আর্জেন্টিনার জয় চাইছেন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। খোদ বার্সা সমর্থকদেরই একটা অংশের কাছে মেসি আবার প্রবলভাবে সমালোচিত। তাঁদের চাপা ক্ষোভ—দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় কাতালুনিয়ায় কাটালেও মেসি কখনোই পুরোপুরি কাতালান ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিজের ভেতর ধারণ করেননি। উপরন্তু, ২০২১ সালে তাঁর বিদায়ের ধরনটাও অনেক কাতালানের মনে এক অদ্ভুত ক্ষত রেখে গেছে।
একদিকে স্প্যানিশ জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে তীব্র কাতালান আবেগ, আর এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মেসি-বন্দনা! সব মিলিয়ে ফাইনালে সমর্থন কাকে— এই সিদ্ধান্তটা এখন আর নিছক ফুটবলের সবুজ গালিচায় আটকে নেই। এটি বরং রূপ নিয়েছে এমন এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিতর্কে, যা দিন শেষে কাতালুনিয়া ও স্পেনের সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উত্তেজনারই এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
রেকর্ডের রাজপুত্র ও মাদ্রিদহীন স্পেনের সমীকরণ
ক্যাম্প ন্যুর সবুজ গালিচায় দীর্ঘ ১৯টি বছর কাটিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২টি গোল আর ৩০৩টি অ্যাসিস্টের সেই অতিমানবীয় পরিসংখ্যান তাঁকে বসিয়েছে কাতালান ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ঈশ্বরের আসনে। এই বিপুল কীর্তি, ট্রফি আর ট্র্যাজিক বিদায়ের মহাকাব্যিক আবহের পর রবিবাসরীয় ফাইনালে কোনো বার্সা সমর্থকের পক্ষে মেসির বিপক্ষে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। স্প্যানিশ দৈনিক এএস-এর উপ-সম্পাদক ও লেখক সান্তিয়াগো হিমেনেস স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম প্লাকার-কে কাতালুনিয়ার এই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার এক নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ দেখিয়েছেন। তার মতে, ২০১৭ সালের মতো রাজনৈতিক উত্তাপ এখন রাজপথে না থাকলেও, কট্টর স্বাধীনতাকামীরা আর্জেন্টিনার পক্ষে ‘জীবন বাজি’ রেখে নামবেন; এমনকি তাদের অনেকে হয়তো জীবনে কোনোদিন ফুটবল ম্যাচও দেখেননি!
তবে হিমেনেস একই সঙ্গে স্পেনের পক্ষে যাওয়ার পাল্লাটাও ভারী দেখছেন অন্য এক সমীকরণে। এবারের স্পেন দলে বার্সেলোনার একচেটিয়া আধিপত্য তো আছেই, সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো— ‘চিরশত্রু’ রিয়াল মাদ্রিদের কোনো খেলোয়াড়ের উপস্থিতি নেই লা রোহাদের মূল একাদশে। ফলে সাধারণ কাতালানদের স্পেনের ট্রফিটা মেনে নিতে কষ্ট কম হবে। আর যদি আর্জেন্টিনা জিতেও যায়, সান্তিয়াগো হিমেনেসের ভাষায়, ‘মেসির প্রতি যে সর্বজনীন ভালোবাসা এখানে আছে, তাতে আর্জেন্টিনার জয়ে কষ্টটা অন্তত একটু কমই লাগবে।’
সব মিলিয়ে, মাঠের ফুটবলে স্পেন বনাম আর্জেন্টিনার এই ফাইনাল যেমন ভারসাম্যের এক লড়াই, মাঠের বাইরে কাতালুনিয়ার গণমানুষের সমর্থন আর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটাও ঠিক ততটাই সমান্তরাল আর অমীমাংসিত।
সময়ের আলো/আআ