ব্যক্তিগত ৩২৮ রানে দাঁড়িয়ে ডাগআউটের দিকে তাকিয়ে তাওহীদ হৃদয় জানতে চাইলেন, ‘আর কত লাগে?’ প্রশ্নটা শুনেই বোঝা গেল নিজের ট্রিপল সেঞ্চুরির পর এবার আরেকটি রেকর্ডের খোঁজে নেমেছেন তিনি। তবে তার আগে এলো চা বিরতি।
বিরতি শেষে মাঠে ফিরেই অবশ্য আর বেশি সময় নিলেন না। কিছুক্ষণ পর ছক্কা মেরে ভেঙে ফেললেন তামিম ইকবালের ছয় বছর আগের রেকর্ড (৩৩৪ রান)। তামিমকে ছাড়িয়েই থেমে যাননি, ৩৫০ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন হৃদয়।
পচেফস্ট্রুমে ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন হৃদয়। এ মাঠে ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নামার আগে পুরোনো স্মৃতি নিয়েও লিখেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ মাঠকে বলেছিলেন বাংলাদেশের লাকি ভেন্যু। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচের শেষ দিনের শেষ সেশনে এই কীর্তি গড়েছেন ২৫ বছর বয়সি হৃদয়। শেষ পর্যন্ত ৩৫০ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের এটাই এখন সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
এর আগে রেকর্ডটি ছিল তামিম ইকবালের দখলে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ম্যাচে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে পূর্বাঞ্চলের হয়ে ৪২৬ বলে ৩৩৪ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন তামিম। সেই ইনিংসে ছিল ৪২টি চার ও ৩টি ছক্কা। ছয় বছর পর তামিমকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক হলেন হৃদয়।
নিজের রেকর্ড ভাঙতে দেখে তামিম নিজেও উচ্ছ্বসিত। ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পর্যায়ের, যেকোনো প্রেক্ষাপটে ৩৫০ রানের ইনিংস খেলতে পারা দারুণ ব্যাপার। সেই ইনিংস যদি হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়, তা হলে সেটিকে বলতে হয় অসাধারণ। ইতিহাস গড়ার জন্য অভিনন্দন তাওহীদ হৃদয়।’
এমনিতেই এই ম্যাচে ইতিহাস গড়েছেন হৃদয়। ক্যারিয়ারের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি করার পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩০০ রান করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়েও প্রথমবার কোনো ব্যাটার ৩০০ রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন।
হৃদয়ের আগে বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল আর মাত্র দুজনের। ২০২০ সালে তামিমের ৩৩৪* এবং ২০০৬-০৭ মৌসুমের জাতীয় ক্রিকেট লিগে বরিশাল বিভাগের হয়ে রকিবুল হাসানের ৩১৩*। রকিবুলের সেই ইনিংস ছিল সিলেট বিভাগের বিপক্ষে। অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটারদের তিনটি ট্রিপল সেঞ্চুরি এখন তামিম, রকিবুল ও হৃদয়ের নামে। তবে সর্বোচ্চটি এখন হৃদয়ের।
শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটেই নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেও ইতিহাস গড়েছেন হৃদয়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রোটিয়াদের মাঠে বিদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক এখন তিনি। এর আগে রেকর্ডটি ছিল ইংল্যান্ডের সাবেক ব্যাটার ডেনিস কম্পটনের। ১৯৪৮-৪৯ মৌসুমে এমসিসির হয়ে ঠিক ৩০০ রান করেছিলেন তিনি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সব ব্যাটার মিলিয়ে সর্বোচ্চ ইনিংসের তালিকায় হৃদয়ের সামনে এখনও একজন আছেন। ২০০৯-১০ মৌসুমে প্রোটিয়াদের ঘরোয়া লিগে ৩৯০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন স্টিফেন কুক।
দেশের বাইরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডও এখন হৃদয়ের। এতদিন এই রেকর্ড ছিল জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুতের। ২০০৩ সালে পাকিস্তানে ডিফেন্স হাউজিং অথরিটির বিপক্ষে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ২১৮ রান করেছিলেন তিনি।
হৃদয়ের ব্যাটে আরও একটি দলীয় ইতিহাসও তৈরি হয়েছে। তার ট্রিপল সেঞ্চুরির সৌজন্যে প্রথমবারের মতো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৬০০ রানের ঘরে পা রেখেছে বাংলাদেশ ‘এ’ দল। এর আগে নিজেদের ইতিহাসে কোনো ইনিংসে ৬০০ রান করতে পারেনি তারা।
ডাবল সেঞ্চুরি থেকে ট্রিপল সেঞ্চুরি, এরপর তামিমকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। আর তার সঙ্গে একের পর এক নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে