বাগেরহাটে জুলাই শহিদ মাহফুজের স্বজনদের কান্না থামেনি আজও

বাগেরহাট প্রতিনিধি

সারাদেশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহিদ হওয়া বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের হরতকিতলা গ্রামের কিশোর মাহফুজুর রহমানের পরিবার আজও চরম

2026-07-20T23:34:06+00:00
2026-07-21T01:32:00+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বাগেরহাটে জুলাই শহিদ মাহফুজের স্বজনদের কান্না থামেনি আজও
বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম  আপডেট: ২১.০৭.২০২৬ ১:৩২ এএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহিদ মাহফুজের মা। ছবি : সময়ের আলো
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহিদ হওয়া বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের হরতকিতলা গ্রামের কিশোর মাহফুজুর রহমানের পরিবার আজও চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আপন চাচা ও আত্মীয়দের অব্যাহত হুমকি এবং হয়রানির মুখে গত প্রায় তিন মাস ধরে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন স্বজনরা। একদিকে সন্তান হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত জীবন— এই জোড়া কষ্টে মানবেতর দিন পার করছেন তারা।

শহিদ মাহফুজের বাবা আব্দুল মান্নান অভিযোগ করে বলেন, আমার বড় ভাই মো. আলতাফ হোসেন, তার ছেলে মতিয়ার রহমান এবং অন্য ভাইয়ের ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেন সোহেল বিভিন্নভাবে আমাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছে। তিন মাস ধরে আমরা বাড়ি ছাড়া। পরিবারের সবাই চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। আমি দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।


ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ মা-বাবা। আব্দুল মান্নান বলেন, মার মাহফুজ ক্রিকেট খেলতে খুব ভালোবাসত। ওর স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে অফিসার হবে। বলত, বাবা-মাকে ঢাকায় ফ্ল্যাটে রাখব, আর কষ্ট করতে দেব না। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। ও বেঁচে থাকলে আজ ওরও ফল আসত। পরীক্ষা দিয়ে এসে যে শার্টটি খুলে রেখেছিল, আজও সেই শার্টের গন্ধ নিয়ে ছেলেকে অনুভব করি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, তিন মাস ধরে সন্ত্রাসীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। নিজের ছেলের কবরের পাশেও থাকতে পারছি না। প্রতিদিন চরম আতঙ্ক নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে।

মাহফুজের মা বেগম বলেন, আজও ছেলের জামায় ওর গায়ের গন্ধ পাই। আমার সন্তানকে কেন গুলি করে হত্যা করা হলো? ও তো শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। যদি জেলে রাখত, তবুও তো অন্তত ছেলের মুখটা দেখতে পারতাম! যারা এই গুলির নির্দেশ দিয়েছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে গুলিতে নিহত হন মিরপুর আব্বাস উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র মাহফুজুর রহমান। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে সে আর ফেরেনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজির পর শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার মরদেহ শনাক্ত করা হয়।

পরদিন গভীর রাতে গ্রামের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে এসে দাফন করা হয়। পরিবারের দাবি, দাফনের সময়ও রাজনৈতিক হয়রানি ও নানান প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন ছিল যে দাফন সম্পন্নের পরপরই তারা অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে আব্দুল মান্নান পরিবারসহ গ্রাম ছেড়ে ঢাকার মিরপুরে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। সেখানেই ২০১০ সালে জন্মগ্রহণ করে মাহফুজুর রহমান। চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে ছিল সে।

সরকারিভাবে শহিদ পরিবারের জন্য ‘জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ থেকে এককালীন ৫ লাখ টাকা, জেলা পরিষদ থেকে ২ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। তবে বৃদ্ধ বয়সে নিরাপদে জীবনযাপনের জন্য স্থানীয় গুলিশাখালী বাজারে একটি সরকারি দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং মোরেলগঞ্জ শহরে সামান্য খাসজমি বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন শহিদের বাবা-মা। এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করা হলেও দীর্ঘ দিন ধরে কোনো সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ তাদের।

এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাবিবুল্লাহ জানান, জুলাই-২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকারি গেজেটভুক্ত শহিদের তালিকায় মোরেলগঞ্জের মাহফুজুর রহমান, আলভি ও নূরু মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের পরিবারকে বিভিন্ন সরকারি অনুদান ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খাসজমি বরাদ্দের বিষয়টি নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে বিবেচিত হয়, এটি সহকারী কমিশনারের (ভূমি) একক এক্তিয়ারভুক্ত নয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রাষ্ট্র যাদের শহিদের মর্যাদা দিয়েছে, তাদের পরিবারের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবারের প্রতি হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তারা।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   বাগেরহাট  জুলাই  শহিদ মাহফুজ  কান্না  বাগেরহাট  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: