সার্বভৌমত্বহীন প্রশাসনে ফিলিস্তিনের মুক্তি আসবে না

জাকির পারভেজ

মতামত

প্রায় তিন বছর ধরে ইসরাইল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা দাবি করে আসছে যে, নগাজায় হামাসের শাসনই ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে

2026-07-21T05:50:11+00:00
2026-07-21T05:50:11+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
সার্বভৌমত্বহীন প্রশাসনে ফিলিস্তিনের মুক্তি আসবে না
জাকির পারভেজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রায় তিন বছর ধরে ইসরাইল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা দাবি করে আসছে যে, নগাজায় হামাসের শাসনই ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি স্থাপনের প্রধান অন্তরায়। তারা যুক্তি দেখিয়েছিল, হামাস ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত গাজার গণহত্যামূলক যুদ্ধ শেষ হতে পারে না। তারা বলেছিল, গাজার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে হামাসের পরিবর্তে একটি বিকল্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। এখন, হামাস গাজার শাসনভার পরিচালনাকারী সংস্থা বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে, তারা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা-এর কাছে বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। এই ঘোষণাটি বিতর্কের শর্তাবলি পাল্টে দিয়েছে।  

যদি হামাসের শাসনই গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পথে ঘোষিত বাধা হয়ে থাকে, তা হলে হামাসবহির্ভূত একটি ফিলিস্তিনি সংস্থা গঠন করে সেই দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করা উচিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী দলীয় রাজনীতিকদের পরিবের্তে ফিলিস্তিনি পেশাজীবীদের নিয়ে সরকার গঠিত হবে। 

Advertisement
এতে প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও প্রশাসক থাকবেন। যাদের দায়িত্ব হবে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, জনসেবা এবং পুনর্গঠনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। এই সরকারের সদস্যদের মধ্যে হামাসের কোনো কর্মকর্তা থাকবে না এবং তারা কোনো দলীয় প্ল্যাটফর্মের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন না। তাদের ভূমিকা হবে, বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বেসামরিক জীবনযাত্রার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

ফিলিস্তিনিরা যতবারই একটি রাজনৈতিক সূত্রের কাছাকাছি পৌঁছায়, ততবারই মনে হবে- সেই সূত্রটি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার আগেই আরেকটি নতুন শর্তের উদ্ভব হয়। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনিরা যখন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, তখন হামাস সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল। সেই বিজয়ের পর নির্বাচিত ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। 

বরং এর পরিবর্তে তাদের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, আন্তর্জাতিক সহায়তা স্থগিত এবং ইসরাইলের আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়। এরপর থেকে ফিলিস্তিনিদের বারবার বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা দেখেছে, প্রতিটি বিকল্প নেতৃত্বকেই ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকা রাজনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করা হচ্ছে। ফলে, বিষয়টি শুধু হামাসকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বৃহত্তর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আসলে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করার অনুমতি কার রয়েছে? 

প্রতিটি জাতি তার নিজস্ব রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক করে। সরকার আসে, সরকার যায়। নির্বাচনে কেউ বিজয়ী হয়, কেউ পরাজিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো কখনো জনসমর্থন অর্জন করে, আবার কখনো তা হারায়। ফিলিস্তিনিরাও এর ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য জাতির মতো তারাও নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মতভেদে জড়ায়। তবে, ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো- এসব বিতর্ক খুব কমই তাদের অভ্যন্তরীণ পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে। 

বরং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা, বারবার বহিরাগত পক্ষগুলোর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। ফিলিস্তিনি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা কিংবা গাজার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া- এগুলোর যেটাই অনুসরণ করা হোক না কেন, সামগ্রিক প্রবণতা ছিল ফিলিস্তিনিদের স্বশাসনকে সক্ষম করে তোলার পরিবর্তে তা সীমিত করে রাখা।

এই প্রশ্নটি যে সহজ, এমন মনে করা কারও উচিত নয়। হামাস এখনও একটি সশস্ত্র আন্দোলন। গাজায় ব্যাপক সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার যুক্তি হিসেবে ইসরাইল নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলে যাচ্ছে। নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। হামাস বেসামরিক প্রশাসন থেকে সরে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেই এসব বাস্তবতা দূর হয়ে যায় না। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই সেই মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দেয় না। প্রশ্নটি হলো- গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে? আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রায়ই ধরে নেওয়া হয় যে, গাজার প্রশাসক বদলালেই ইসরাইলের আচরণ মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে খুব বেশি সমর্থন দেয় না। 

এমনকি আলোচনা ও ঘোষিত যুদ্ধবিরতির সময়েও গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত ছিল, আর অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা আরও তীব্র হয়েছিল। গাজা কারা শাসন করেছে, কেবল এটির পরিণতি হিসেবে কখনোই মানবিক বিপর্যয় আসেনি। এই বিপর্যয় এসেছে- ফিলিস্তিনিদের জীবনের ওপর ইসরাইলের কঠোর সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। এটি নিছক কোনো তাত্ত্বিক উদ্বেগ নয়। 

ঘোষিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনী গাজার বৃহৎ অংশ দখলে রেখেছে, অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে সামরিক অঞ্চল বজায় রেখেছে এবং হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে, এই ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের প্রশাসন এমন একটি ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে; যেখানে ক্ষমতার সবচেয়ে নির্ধারক ক্ষেত্রগুলো এখনও ফিলিস্তিনিদের কর্তৃত্বের বাইরে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে একটি টেকনোক্রেটিক প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ, হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ, বিদ্যুৎব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং বেসামরিক বিষয়াদি পরিচালনার দায়িত্বে থাকতে পারে। 

কিন্তু যে পরিস্থিতিগুলো মানবিক সংকটকে অব্যাহত রেখেছে, সেগুলোর ওপর তাদের প্রায় কোনো কর্তৃত্বই থাকবে না। ইসরাইল গাজার সীমান্ত, আকাশসীমা ও উপকূলরেখার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে পারে। ফলে, মানুষের চলাচল ও পণ্যের পরিবহনও ইসরাইলের অনুমোদনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া পুনর্নির্মাণের উপকরণ প্রবেশে বিধিনিষেধ বহাল থাকতে পারে। থাকতে পারে ইসরাইলের সামরিক অভিযান চালনার অবাধ স্বাধীনতা। ফিলিস্তিনিদের হয়তো একটি প্রশাসনিক সংস্থা থাকবে, কিন্তু প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন থাকবে না। 

আশঙ্কা হলো, গাজার ভবিষ্যৎ এমন এক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে, যেখানে থাকবে সার্বভৌমত্বহীন প্রশাসন, ক্ষমতাহীন দায়িত্ব ও স্বাধীনতাহীন শাসন। এই ভেদরেখাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্বশাসন ও নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে। স্বশাসনব্যবস্থা জাতিকে নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার সুযোগ দেয়। আর অন্যটি তাদের নিজেদেরই পরনির্ভরতা পরিচালনা করতে বলে। 

একটি টেকনোক্রেটিক সরকার দক্ষতার সঙ্গে ত্রাণ বিতরণ, পুনর্গঠন কার্যক্রম সমন্বয় এবং অত্যাবশ্যকীয় জনসেবাগুলো পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু যদি এটি স্থায়ী বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত হয় এবং সীমান্ত, নিরাপত্তা, পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক জীবনের ওপর কোনো অর্থবহ কর্তৃত্ব না থাকে, তা হলে এটি কোনো ফিলিস্তিনি সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করবে না। এটি ফিলিস্তিনিদের পরনির্ভরশীলতার ব্যবস্থাপনাকে তুলে ধরবে।

দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের বলা হয়েছে- শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব, ভিন্ন প্রতিষ্ঠান অথবা ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামো। হয়তো এবার সত্যিই সেই কাঠামোগুলো পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। যদি তাই হয়, তা হলে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন তাদের নিজস্ব ধারাবাহিক বয়ানগুলো প্রমাণ করতে হবে। যদি হামাসের শাসনই প্রকৃত বাধা হয়, তা হলে একটি বিশ্বস্ত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসনের উচিত পুনর্গঠন, রাজনৈতিক নবায়ন এবং শেষ পর্যন্ত একটি ফিলিস্তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এই প্রশাসনের শুধু ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরই নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও পুনর্গঠন করার সুযোগ দেওয়া উচিত। 


তবে যদি পুরোনো শর্তগুলোর জায়গায় শুধু নতুন শর্ত বসানো হয় এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকে তা হলে পরিস্থিতি বদলাবে না। পুনর্গঠনে বাধা দেওয়া হয় এবং ফিলিস্তিনি প্রশাসন যদি বহিরাগত শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে তা হলে শুধু হামাসকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হবে। গাজার ভবিষ্যৎ এমনভাবে নির্ধারিত হতে হবে যাতে মনে না হয় যে, একটি গোষ্ঠীর পরিবর্তে আরেকটি গোষ্ঠী শাসন করছে। 

বরং এরকম হওয়া উচিত যে, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় মানুষ যেসব অধিকার স্বাভাবিকভাবে ভোগ করে; ফিলিস্তিনিরাও সেই মৌলিক অধিকার পাবে। অর্থাৎ তাদের কারা শাসন করবে, এটা তারা নিজেরাই ঠিক করতে পারবে। যতদিন না এই অধিকার স্বীকৃতি পাচ্ছে, ততদিন কোনো সমাধান আসবে না। এটি শুধু সরকারি দফতরের দরজায় নামফলক বদলানো অথবা প্রশাসনিক রূপ পাল্টানো হবে; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের যৌক্তিক সমাধান হবে না।

আলজাজিরা থেকে অনুবাদ 
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 

  বিষয়:   সার্বভৌমত্বহীন  প্রশাসন  ফিলিস্তিন  মুক্তি 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: