ফিফা বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। এর মাহাত্ম্য শেষ হয়নি। ফুটবল নিছকই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং মানুষের পারস্পরিক সংযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্বের সংঘাতমুখর এক সময়ে আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলো। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, সুদান, মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলমান।
অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। সেই বাস্তবতার মধ্যেও বিশ্বকাপ কয়েক সপ্তাহের জন্য বিশ্বের মানুষের দৃষ্টি এক ভিন্ন মানবিক অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে গেছে। ফুটবল এমন এক মহান শিল্প যেটা মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বকাপের আরেকটি বড় বার্তা এসেছে মাঠের প্রতিযোগিতা থেকেই। প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়া বা দীর্ঘদিন পর ফেরা কয়েকটি দেশ দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্য কেবল অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করে না। কেপভার্দে, উজবেকিস্তান, জর্ডান কিংবা কুরাসাওয়ের মতো দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
তাদের অর্জনের পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশ কেপভার্দে এবার বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। দুই দশক আগেও ফিফা র্যাঙ্কিয়ে নিচের সারিতে ছিল দেশটি। ১৯৭৫ সালে স্বাধীন হওয়া দেশটির সম্পদও সীমিত। তবে সুসংগঠিত নীতি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তারা আজকের অবস্থানে এসেছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন দেশে সমর্থকদের সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে ফুটবলপ্রীতির অনন্য নজির দেখা গেছে। আবার বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও অসহিষ্ণুতার ঘটনাও দেখা গেছে। খেলার নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য সামাজিক সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের চর্চা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য এই বিশ্বকাপ একটি আফসোস রেখে গেছে। বিশ্বের অন্যতম উচ্ছ্বসিত ফুটবলসমর্থক হয়েও বাংলাদেশ এখনও বিশ্বকাপের দর্শক মাত্র। প্রতি চার বছর অন্তর দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকায় ছেয়ে যায়। আরও কয়েকটি দেশের সমর্থকও রয়েছে। রাত জেগে মানুষ খেলা দেখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে আলোচনা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেউ বলেন, কেপভার্দে পারে, আমরা কেন পারি না? অনেকে অবকাঠামো বা বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। বাস্তবতা হলো, কেপভার্দেসহ অনেক ছোট দেশ দেখিয়েছে সীমিত সম্পদ দিয়েও ফুটবলে বিশ্বমানের অগ্রগতি সম্ভব। এ জন্য দরকার সুশাসন, প্রতিভা অন্বেষণ, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, মানসম্মত কোচিং এবং শক্তিশালী ঘরোয়া লিগ। ফিফা বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য নিছক বিনোদনের উপলক্ষ হয়ে থাকলে চলবে না। এখান থেকে ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা নিতে হবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল দেখিয়েছে, মানুষ বিভাজন নয়, সম্প্রীতি চায়। এবারের আসর সেই আকাক্সক্ষার এক শক্তিশালী প্রতীক। আজকের পৃথিবীতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউক্রেন, গাজা থেকে সুদান অসংখ্য মানুষ যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সম্প্রীতির আকাক্সক্ষাকে ফুটবল অনন্য এক ভাষায় প্রকাশ করে। বিশ্বকাপের মতো আসরে ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ একই গ্যালারিতে বসে একই আবেগ ভাগ করে নেয়। অপরিচিত মানুষও পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠে। ফুটবল যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সংযোগের যে সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি