চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটানা অতিবর্ষণ ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টি থেমে কয়েক দিন ধরে পানি নামতে শুরু করলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। সরকারি হিসাবে তিনটি খাতে প্রায় ১৩ কোটি টাকার ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার কম নয়। দুর্যোগে অন্তত দুই হাজার কৃষক ও খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস প্রদান করেন সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান।
এ ব্যাপারে সীতাকুণ্ড উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। একইভাবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কল্লোল বড়ুয়া বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
জলাবদ্ধতার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী হিমু মহাজন বলেন, সীতাকুণ্ড উপজেলার অধিকাংশ স্লুইসগেইট ১৯৬২ সালে নির্মিত হওয়ায় বর্তমানে সেগুলোর বেশিরভাগই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নতুন স্লুইসগেইট নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলার খালগুলো পুনর্খনন করা গেলে ভবিষ্যতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলেও মতামত প্রদান করেন সীতাকুণ্ড পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী হিমু মহাজন।
উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দফতরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে প্রায় ৮ কোটি, মৎস্য খাতে ৩ কোটি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১ হাজার ৬০০ হেক্টর ধানি জমির মধ্যে ১১২ হেক্টর এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর সবজি আবাদি জমির মধ্যে ১৮০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু ধান ও সবজি খাতেই প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্র উপকূলীয় অধিকাংশ সøুইসগেট অকার্যকর থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান খাল-নালা ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে তাদের দাবি।
সরেজমিন কথা হয় বাড়বকুণ্ডের কৃষক সফিউল আলমের সঙ্গে। এ সময় তিনি জানান, ৪০ শতক জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ঝিঙা চাষ করেছিলেন। ফলন বাজারে তোলার সময় জলাবদ্ধতায় পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক সফিউল আলম বলেন, পানি নেমে যাওয়ার পর ধান ও সবজি গাছ দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। তার ধারণা পানির সঙ্গে কোনো দূষিত বা বিষাক্ত উপাদান মিশে থাকতে পারে। তবে কৃষি বিভাগের কেউ এখনও মাঠে এসে খোঁজ নেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মুরাদপুর এলাকার কৃষক মোহাম্মদ মহিউদ্দীন বলেন, এক একর ৪০ শতক জমিতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয়ে লাউ ও চিচিঙ্গার আবাদ করেছিলেন। গুলিয়াখালী উপকূলীয় স্লুইসগেইটের ছয়টি গেটের মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় পানি দ্রুত বের হতে পারেনি। এতে তার পাশাপাশি এলাকার প্রায় ৩০০ কৃষক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মৎস্য খাতেও ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ দশমিক ৩৪ হেক্টর আয়তনের ১৭৬টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে প্রায় ১৩৬ দশমিক ৪৫ মেট্রিকটন মাছ ভেসে গেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া পুকুরগুলোর অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকার।
মৎস্যচাষি দিপু জানান, তিন বন্ধু মিলে বারৈয়ারঢালায় ছয়টি বড় পুকুর ও দীঘিতে মাছ চাষ করেছিলেন তারা। অতিবর্ষণে সবগুলো জলমগ্ন হয়ে যাওয়ায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে তাদের। প্রাণিসম্পদ খাতেও জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে। উপজেলার প্রায় ১৬০ একর ঘাসের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৈয়দপুর ইউনিয়নের খামারি সেলিম উদ্দিন জানান, তার খামারে এক হাজার বাচ্চা মুরগি ছিল। পানি ঢুকে প্রায় ৫০০টি বাচ্চা মারা যাওয়ায় তার প্রায় ৪৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি