ফেসবুকে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেছিলেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকার বাসিন্দা মো. তানভীর আহমেদ সিয়াম। সুপার শপে মাসিক ১৮ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি পেয়ে তিনি ইন্টারভিউও দেন। তবে চাকরি পাওয়ার আগেই রেজিস্ট্রেশন, ড্রেস, আইডি কার্ড ও প্রশিক্ষণের নামে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় কয়েক হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। একই অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফেসবুকে প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে তারা ড্রাগনশীল সিকিউরিটি সলিউশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইন্টারভিউয়ের সময় আবেদনকারীদের কাছ থেকে ৬০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হয়। পরে জানানো হয়, তারা সুপার শপে চাকরির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তানভীর আহমেদ সিয়াম জানান, এইচএসসি পাসের পর তার বাবা মনির সরদার অনেক কষ্টে চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্টসে চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বেশি বেতনের আশায় তিনি নতুন চাকরির জন্য আবেদন করেন। পরে ড্রেস ও আইডি কার্ডের জন্য ৬ হাজার টাকা এবং প্রশিক্ষণের নামে আরও অর্থ দিতে হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রশিক্ষণের জন্য তাদের যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত রয়েল টাইগার্স সিকিউরিটি সার্ভিসে পাঠানো হয়। সেখানে কর্মকর্তারা নিজেদের সেনাবাহিনী ও র্যাবের সাবেক বা বর্তমান সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। ভিজিটিং কার্ডেও এমন পরিচয় ব্যবহার করতে দেখা গেছে। প্রশিক্ষণ, খাবার ও ইউনিফর্মের খরচ দেখিয়ে আরও অর্থ নেওয়া হয়।
একপর্যায়ে চাকরিপ্রার্থীরা জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত সুপার শপের চাকরি নেই। বরং, দেশের বিভিন্ন জেলায় সাধারণ নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে তাদের পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সেখানে বেতন নির্ধারণ করা হয় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ওই বেতন থেকেও বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়ার কথা বলা হয়।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন তুহিন, ইসমাইল, স্বাধীন ও আশিকসহ আরও কয়েকজন। তাদের দাবি, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার পর নিম্ন বেতনের ভিন্ন চাকরিতে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ চাকরি না করতে চাইলে, জমা দেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সাংবাদিকরা যাত্রাবাড়ীতে রয়েল টাইগার্স সিকিউরিটি সার্ভিসের কার্যালয়ে গেলে, সেখানে অবস্থানরত চাকরিপ্রার্থীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বেলায়েত হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং লোকজন নিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
এদিকে, ড্রাগনশীল সিকিউরিটি সলিউশন লিমিটেডের পক্ষে নিয়োগ কার্যক্রমে যুক্ত থাকা রত্না রহমানও নিজেকে প্রতারণার শিকার দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘চাকরির নামে অর্থ আদায় এবং প্রতিশ্রুত পদে নিয়োগ না দেওয়ার ঘটনায় অনেক তরুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান রত্না।
অন্যদিকে, ড্রাগনশীল সিকিউরিটি সলিউশন লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো. সাইফের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘চাকরির নামে অগ্রিম অর্থ দাবি করা হলে প্রার্থীদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনি সহায়তা নিতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত চাকরির বিজ্ঞাপনে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, অফিসের ঠিকানা, পূর্বের কার্যক্রম ও নিয়োগের শর্ত যাচাই করা জরুরি। অন্যথায়, চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
সময়ের আলো/মহু