ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম এবং শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে যে ক্ষোভ অনলাইনে শুরু হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে বড় ধরনের রাজপথের আন্দোলনে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীর অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই বিক্ষোভ কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারকে নতুন করে উদ্বেগের মুখে ফেলেছে।
আন্দোলনের শুরুতে প্রধান দাবি ছিল দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দাবি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন তারা শুধু একজন মন্ত্রীর পরিবর্তন নয়, পুরো সরকারের জবাবদিহি দাবি করছেন। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের আন্দোলন আগের অনেক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ভিন্ন। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
আন্দোলনের অভিযোগ এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে
প্রথম দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও, ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার্থীদের হতাশা, আত্মহত্যার ঘটনা এবং চাকরির নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় বিক্ষোভকারীরা এখন প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেই ব্যাখ্যা চাইছেন।
তাদের বক্তব্য, শুধু মন্ত্রী পরিবর্তন করলে সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থার সংস্কার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন
এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ক্ষোভ ধীরে ধীরে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
দিল্লির জন্তর-মন্তর ও সংসদ এলাকার আশপাশে যারা বিক্ষোভ করছেন, তাদের অনেকেই নিজেদের উদ্যোগে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশলে এই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
পুরোনো বিভাজনের কৌশল এখানে কার্যকর হচ্ছে না
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে অনেক আন্দোলনকে ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এবারের প্রতিবাদের মূল বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন—শিক্ষা, চাকরি, পরীক্ষা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ।
এ কারণে আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমছে
অনেক আন্দোলনকারী মনে করছেন, আদালত, সংসদ এবং মূলধারার গণমাধ্যম তাদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। ফলে তারা মনে করছেন, নিজেদের দাবি তুলে ধরার জন্য রাজপথই এখন সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন চললেও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করছেন আন্দোলনকারীরা।
তারা জানতে চাইছেন— বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ী কে? ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বন্ধ করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? কেন কেউ এর দায় স্বীকার করছেন না?
সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মূলত প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কঠোর অবস্থান নিয়ে এই ক্ষোভ থামানো কঠিন হতে পারে।
পুলিশি নজরদারি, বাধা, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের মতো পদক্ষেপের মধ্যেও অনেক তরুণ রাস্তায় অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, এবার শুধু ভয় দেখিয়ে বা বিভাজনের রাজনীতি করে এই প্রতিবাদ থামানো সহজ হবে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন আরও বড় অসন্তোষের প্রতিফলন— যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের জবাবদিহির বিষয়গুলো একসঙ্গে সামনে এসেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ