চট্টগ্রামে ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের পর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারী বৃষ্টির পর এখন থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে এডিস মশার প্রজনন বাড়তে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। জুনের তুলনায় চলতি জুলাইয়ে ডেঙ্গু শনাক্তের সংখ্যাও বেড়েছে। এভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রতি বছর ডেঙ্গুর মৌসুমে ঘুরেফিরে নগরীর আটটি ‘হটস্পট’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপেও এসব এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি ও প্রজননস্থল বেশি পাওয়া গেছে। আটটি হটস্পটই ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ার্ড। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এসব ওয়ার্ডে আগাম সতর্কতামূলক কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতি বছর ওই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি থাকছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। জরিপে এসব ওয়ার্ডে এডিস মশার উপস্থিতি বেশি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো হলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ২ নম্বর আলকরণ, ৩ নম্বর পাহাড়তলী, ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ও ৩৯ নম্বর দক্ষিণ বালুচরা।
গত বছর নগরীর ২৫টি এলাকাকে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত আট ওয়ার্ডের কয়েকটি গত বছরের তালিকাতেও ছিল। ২০২৪ সালের হটস্পটের তালিকায়ও এবারের চিহ্নিত কয়েকটি ওয়ার্ডের নাম ছিল। গত কয়েক বছরের হটস্পটের তালিকাতেও রয়েছে এই আট ওয়ার্ডের নাম।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ভারী বর্ষণের চেয়ে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে। ভারী বর্ষণের পর এখন থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে এডিস মশার প্রজনন বাড়তে পারে।
নগরীতে ঘুরেফিরে আটটি হটস্পটে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, হটস্পট এলাকার নাম ঘুরেফিরে একই থাকছে। এবার বর্ষণে এসব হটস্পটে ডেঙ্গুর প্রকোপ বা আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হতে পারে।
হটস্পট কীভাবে চিহ্নিত করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতি বছর ডেঙ্গুর মৌসুমের আগে জরিপ চালানো হয়। এবারও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে যেসব এলাকায় এডিস মশা ও এডিসের লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে, সেসব এলাকাকে হটস্পট বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত এলাকার তথ্য সিটি করপোরেশনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা হটস্পটগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালিয়ে মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মশা নির্মূলের দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের নয় বলেও তিনি জানান।
স্বাস্থ্য অধিদফতর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হটস্পটগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ মশা তাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে না। তবে হাসপাতালগুলোকে চিকিৎসা দেওয়ার উপযোগী করা, চিকিৎসক ও নার্সদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার কাজ করা হয়। এবারও সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (প্রিভেন্টিভ) ডা. হোসনে আরা বেগম বলেন, নগরীর ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে ঘুরেফিরে একই এলাকাগুলোর নাম আসছে। তবে এসব এলাকায় সচেতনতা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। মেয়র হটস্পটগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছেন। সেখানে মশার লার্ভা জন্মায় এমন অবহেলাজনিত কোনো কাজ পাওয়া গেলে জরিমানা করা হবে।
চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম দাবি করে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থাও সহজ করা হয়েছে। চসিকের হাসপাতালেও চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চসিকের একটি হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, প্রতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দেখা যায়, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলো থেকেই রোগী বেশি আসে। এমনকি এসব এলাকায় মৃত্যুর হারও বেশি থাকে। বারবার একই এলাকা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভূমিকা যথাযথ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের রোববার (১৮ জুলাই) পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার তথ্যে দেখা যায়, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ৫২৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন দুজন। সর্বোচ্চ ২৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছেন ৫২ জন। বাকি রোগীরা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে দেখা গেছে, নগরীর প্রতি চারটি বাড়ির মধ্যে প্রায় একটিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব বাড়ির সামনে নোংরা আবর্জনার পাশাপাশি লার্ভা প্রজনন বাড়ায় এমন বর্জ্যও পাওয়া গেছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পটগুলোর বাড়িতে লার্ভা পাওয়ার হার ছিল বেশি।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৭১ জন। ওই বছর মারা যান পাঁচজন। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন এবং মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে চসিক এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মারা যান ১০৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ৪ হাজার ৩২৩ জনে নেমে আসে। ওই বছর মারা যান ৪৫ জন। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন। ওই বছর মারা যান ২৫ জন।
হটস্পটে বেশি জনসংখ্যা ও পুকুর
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হটস্পটগুলোতে মশার প্রজনন বেশি হয়। মশা নির্মূলে এসব এলাকায় ক্র্যাশ প্রোগ্রামও বেশি নেওয়া হয়। তবে এসব ওয়ার্ডের ঘনবসতি ও বেশি জনসংখ্যা সমস্যা তৈরি করছে। চলতি বছর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালিত জরিপেও চিহ্নিত আট হটস্পটের ওয়ার্ডগুলোতে জনসংখ্যা বেশি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হোসনে আরা বেগম বলেন, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ওয়ার্ডগুলোতে জনসংখ্যা অনেক বেশি। সাধারণ কর্মজীবী মানুষের সংখ্যাও বেশি। এসব এলাকার মানুষ খুব বেশি সচেতন নয়। আবার নগরীর খুলশি এলাকার চিত্র ভিন্ন। সেখানে জনসংখ্যা বেশি হলেও মানুষ অনেক সচেতন। অভিজাত শ্রেণির লোকজনের উল্লেখযোগ্য অংশ সেখানে বসবাস করেন। লার্ভার সংখ্যা বিবেচনায় খুলশিকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তুলনামূলকভাবে সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা কম থাকে।
কমছে না হামে আক্রান্তের সংখ্যা
ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা শুরুর আগে থেকেই নগরীতে ছিল হামের প্রাদুর্ভাব। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রতিদিন হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
১৮ জুলাই পর্যন্ত মহানগর ও উপজেলা মিলিয়ে ৪ হাজার ৪২৪ জন হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সরকারি হাসপাতালে তথ্য আড়ালের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হলেও অন্য রোগে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে সরকারি হিসাবে হামের উপসর্গে মৃত্যুর যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে ভিন্ন বলে মনে করেন অনেকে।
তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বরাবরের মতোই দাবি করে আসছেন, হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা কম। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। তাদের দাবি, বর্তমানে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সময়ের আলো/আরবিএন