ছুটি শেষে বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন (২২)। কিন্তু যাত্রাপথেই ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। চলন্ত ট্রেনে বাইরে থেকে ছোড়া একটি পাথর তাঁর ডান চোখে আঘাত করলে গুরুতর জখম হন তিনি। চিকিৎসকদের ভাষ্য, আঘাত এতটাই ভয়াবহ যে তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে মাথায়ও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও কামারখন্দ উপজেলার মধ্যবর্তী দৌলতপুর ইউনিয়নের ছাগলা-পাগলাদহ রেলসেতু এলাকায় পৌঁছালে দুর্বৃত্তদের ছোড়া একটি পাথর ট্রেনের জানালা ভেদ করে সাব্বিরের ডান চোখে এসে আঘাত হানে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই রক্তাক্ত হয়ে পড়েন সাব্বির। আতঙ্কিত যাত্রীরা দ্রুত ট্রেনটি জামতৈল স্টেশনে থামিয়ে তাঁকে নামিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে রাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানান, আঘাতে সাব্বিরের ডান চোখের কর্নিয়া সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং কর্নিয়ার নিচের হাড়ও ভেঙে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, ওই চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফেরানো সম্ভব নয়। মাথার আঘাতের মাত্রা নির্ণয়ে তাঁর সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। পরবর্তী অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে রাজধানীর শ্যামলীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
সাব্বির জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তাঁর বাবা একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত। বাবার সঙ্গে ঢাকায় থেকেই পড়াশোনা করতেন সাব্বির।
ছেলের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বাবা দুলাল হোসেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তাঁর ছেলের ডান চোখ আর রক্ষা করা সম্ভব নয়। অস্ত্রোপচারের জন্য অন্তত দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন, যা একজন নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে তাঁর পক্ষে জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উল্লাপাড়া থেকে কামারখন্দের জামতৈল পর্যন্ত ছাগলা-পাগলাদহ রেলসেতু, চতরার দহ ও ঘাটিনা রেলসেতুসহ কয়েকটি নির্জন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। এসব স্থান থেকে প্রায়ই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। অতীতেও এমন একাধিক ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবুহেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ঘটনাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেনি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, রেলপথে দুর্ঘটনা ও নাশকতা প্রতিরোধে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিরাপত্তা বিভাগ নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও লিফলেট বিতরণ করছে।
এদিকে, সিরাজগঞ্জ বাজার রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ জামতৈল স্টেশনে গিয়ে আহত শিক্ষার্থীর খোঁজখবর নিয়েছে। কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্তে তদন্ত চলছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/এসএকে