নয়াদিল্লির রাজপথে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে আমার মনে বারবার একটা প্রশ্ন এসেছে, ভারতের মতো একটি সুসংহত গণতান্ত্রিক কাঠামোতেও কি নেতৃত্বহীন এক তরুণ ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যেভাবে মোদি সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
গল্পটা শুরু হয়েছিল নিতান্তই একটা ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ থেকে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কটাক্ষ করে ত্রিশ বছর বয়সি অভিজিৎ দিপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডাক দেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ার। প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব আর শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে কেন্দ্র করে অল্প সময়েই লাখো তরুণের সমর্থন জুটে যায় এই সিজেপির পেছনে, যা প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সংসদ অভিমুখে তাদের পদযাত্রার এক দিন পরই রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে নিজেদের পদযাত্রা শুরু করেন। রাহুল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বর্বরতার জন্য সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে, আর সিজেপির দাবি থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেন। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবসহ শীর্ষ বিরোধী নেতারা একসঙ্গে বসে বিক্ষোভে শামিল হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দিল্লি পুলিশ জোর করে রাহুল গান্ধীকে পুলিশ ভ্যানে তুলে নেয় এবং তাকে ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের একটি সুরক্ষিত স্থানান্তরিত কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রিয়াঙ্কা, খাড়গে ও অখিলেশ যাদবও একই সঙ্গে আটক হন।
এই আন্দোলনকে আগের ভারতীয় প্রতিবাদ থেকে আলাদা করে তোলার পেছনে কয়েকটি সূক্ষ্ম কারণ আছে, যা গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করলে ধরা পড়ে না। প্রথমত এটি কোনো একক নেতা বা সংগঠনের কাঠামোবদ্ধ আন্দোলন নয় বরং লাখো তরুণের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত, যাকে কোনো একটি চেহারায় আটকে ফেলা কঠিন। দ্বিতীয়ত ভারতীয় শাসক দল অতীতে যেভাবে ভিন্নমতকে ধর্ম বা আঞ্চলিকতার তকমা দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলত, পরীক্ষা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আর কর্মসংস্থানের মতো সর্বজনীন প্রশ্নের সামনে সেই কৌশল কার্যকর হচ্ছে না, কারণ শিক্ষা ও বেকারত্বের ক্ষোভ ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চল নির্বিশেষে সব তরুণকে একই কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত বিচার বিভাগ ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতি তরুণদের আস্থা কমে যাওয়ার ফলেই তারা প্রাতিষ্ঠানিক পথ ছেড়ে রাজপথকেই একমাত্র ভরসাযোগ্য মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে যেকোনো সরকারের জন্য বিপজ্জনক একটি প্রবণতা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলনে কি সত্যিই মোদির গদি নড়ে যাবে? আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, স্বল্পমেয়াদে এই সম্ভাবনা ক্ষীণ। লোকসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের যে সাংখ্যিক শক্তি আছে, তাতে অনাস্থা প্রস্তাব আনার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা বিরোধীদের নেই। তার ওপর গত মে মাসেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে, দীর্ঘ পনেরো বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে দুইশ বেশি আসনে জয়লাভ করে ১৪৮-এর ম্যাজিক ফিগার অনেক ছাড়িয়ে যায় দলটি।
এই ফল প্রমাণ করে বিজেপির নির্বাচনি যন্ত্র এখনও যথেষ্ট সক্রিয়, আর আরএসএসের মাঠ পর্যায়ের সাংগঠনিক গভীরতা এমন এক মূলধন, যা কোনো রাজধানীকেন্দ্রিক আন্দোলনে সহজে টলে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে ছবিটা এত সরল নয়। রয়টার্সের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিরোধী দলগুলোর সমর্থন এই আন্দোলনকে অর্থ, সংগঠন আর জাতীয় পরিচিতি এনে দিতে পারে, যদিও ঝুঁকিও আছে, কারণ শিক্ষার্থীদের মূল দাবি বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডার আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এই দ্বন্দ্বটাই আসলে আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, ছাত্র আন্দোলনের নৈতিক পুঁজি আর দলীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ একসঙ্গে চলতে পারলে তবেই তা টেকসই চাপ তৈরি করবে, নইলে ২০১১ সালের আন্না হাজারে আন্দোলনের মতো এটিও ধীরে ধীরে দলীয় বিভাজনে হারিয়ে যেতে পারে। আমার মূল্যায়নে, এই আন্দোলন মোদিকে তাৎক্ষণিকভাবে গদিচ্যুত না করলেও তার দীর্ঘদিনের অপরাজেয় ভাবমূর্তিতে একটা স্থায়ী চিড় ধরিয়ে দিয়েছে, যা আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে।
উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকালে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, নেপালে জেন-জি আন্দোলন, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটকেন্দ্রিক গণবিক্ষোভ, এখন ভারতেও প্রায় একই বয়সি প্রজন্ম রাস্তায় নেমে এসেছে দুর্নীতি আর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে। সংবাদমাধ্যম যথার্থই লিখেছে, বাংলাদেশ ও নেপালের দৃষ্টান্তের পরেও তরুণদের ক্ষোভ বুঝতে ভুল করেছেন মোদি। প্রতিটি দেশের প্রেক্ষাপট আলাদা, রাজনৈতিক কাঠামোও ভিন্ন, তবু এই মিল একেবারে কাকতালীয় বলে মনে হয় না বরং এটি দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটি প্রজন্ম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও স্বচ্ছতার অভাবের প্রশ্নে ক্রমশ কম ধৈর্যশীল হয়ে উঠছে।
আর বিজেপির ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলা যায়? দলটির সাংগঠনিক গভীরতা, আরএসএসের মাঠ পর্যায়ের নেটওয়ার্ক আর একাধিক রাজ্যে একচ্ছত্র ক্ষমতা এখনও তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু বারো বছরের শাসনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ক্লান্তি, তরুণ ভোটারদের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে জমে থাকা ক্ষোভ, আর বিরোধী জোটের নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা সামনের নির্বাচনগুলোতে দলটির জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বিক্ষোভকারীদের ওপর পেলেট গানের ব্যবহারের অভিযোগ যেভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জায়গা পেয়েছে, তা সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ ভয়ের যে প্রাচীর একসময় বিরুদ্ধমতকে দমিয়ে রাখত, তরুণরা এবার সেই প্রাচীর নিজেরাই ভেঙে দেখিয়েছে।
সবশেষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে ভাবতে গিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে, আর দিল্লির এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ঢাকার জন্য কূটনৈতিক সুযোগ ও ঝুঁকি দুটোই বহন করে। মোদি সরকার যদি অভ্যন্তরীণ সংকট সামলাতে ব্যস্ত থাকে, তা হলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানিবণ্টন কিংবা বাণিজ্য আলোচনার মতো দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে অগ্রগতি সাময়িকভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে ভারতের এই তরুণ আন্দোলন বাংলাদেশের পাঠকের কাছেও একটা পরিচিত ছবি হয়ে উঠছে, কারণ কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা আর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্নে তরুণ প্রজন্মের এই অধৈর্য শুধু ভারতের নিজস্ব বিষয় নয় বলেই মনে হয় বরং এটি এই মুহূর্তে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি লক্ষণীয় প্রবণতা। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আঞ্চলিক নেতাদের এখন নতুন করে ভাবতে হবে তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষা নিয়ে, কারণ ভয় দিয়ে যে ক্ষোভ চিরকাল দমিয়ে রাখা যায় না, দিল্লির রাজপথ তা আরেকবার প্রমাণ করে দিল।
প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ