ইসলামে ইবাদতের শুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত হলো পবিত্রতা। আর সেই পবিত্রতা অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো অজু। নামাজের জন্য অজু ফরজ হলেও এর গুরুত্ব শুধু নামাজেই সীমাবদ্ধ নয়। অজু একজন মুমিনকে বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আত্মিক পবিত্রতারও শিক্ষা দেয়। তাই ইসলামে অজু কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি ইবাদত, যা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন করাই সর্বোত্তম।
নবীজি (সা.) যেভাবে অজু করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম তা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং হাদিসের কিতাবগুলোতে সংরক্ষণ করেছেন। ফলে একজন মুসলমান চাইলে খুব সহজেই সুন্নাহ অনুযায়ী অজুর পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।
অজুতে মিতব্যয়িতা
বর্তমান সময়ে অনেকেই অজুর সময় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পানি ব্যবহার করেন। অথচ নবীজি (সা.) ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী। তিনি সাধারণত এক ‘মুদ’ পরিমাণ পানি দিয়েই পূর্ণাঙ্গ অজু সম্পন্ন করতেন। অধিকাংশ আলেমের মতে, এর পরিমাণ প্রায় ৬২৫ মিলিলিটার, আর হানাফি আলেমদের মতে প্রায় এক লিটার। অর্থাৎ আধা লিটার থেকে সর্বোচ্চ এক লিটার পানিই তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল।
তিনি পানির অপচয়কে অপছন্দ করতেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি প্রবাহমান নদীর তীরেও অযথা পানি অপচয় না করার শিক্ষা ইসলামে রয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইসলাম পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সম্পদের সঠিক ব্যবহারেরও শিক্ষা দেয়।
অজুর অঙ্গ ধোয়ার নিয়ম
হাদিসে দেখা যায়, নবীজি (সা.) কখনো অজুর অঙ্গ একবার, কখনো দুবার এবং অধিকাংশ সময় তিনবার করে ধৌত করেছেন। তবে তিনবারের বেশি ধোয়াকে তিনি সীমালঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। তাই অজুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি নয়, বরং সুন্নাহ অনুযায়ী পরিমিতি বজায় রাখাই উত্তম।
কুলি, নাকে পানি ও মাসাহ
নবীজি (সা.) ডান হাতে পানি নিয়ে কুলি করতেন এবং নাকে পানি দিতেন। এরপর বাঁ হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করতেন। তিনি কখনো কুলি ও নাকে পানি দেওয়া একসঙ্গে করতেন, আবার কখনো আলাদাভাবেও করতেন।
মাথা মাসাহ করার সময় দুই হাত মাথার সামনের অংশ থেকে পেছনের দিকে নিয়ে আবার সামনে ফিরিয়ে আনতেন। একই সঙ্গে কানের ভেতরের ও বাইরের অংশও মাসাহ করতেন। মাথায় পাগড়ি থাকলে পাগড়ির ওপর মাসাহ করারও প্রমাণ হাদিসে রয়েছে।
দাড়ি ও আঙুল খিলাল
দাড়িওয়ালা ব্যক্তিদের জন্য দাড়ি খিলাল করা সুন্নাহ। নবীজি (সা.) আঙুল দিয়ে দাড়ির ভেতরে পানি পৌঁছে দিতেন এবং এটিকে আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে পায়ের আঙুলগুলোর মাঝেও তিনি কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে খিলাল করতেন, যাতে কোনো অংশ শুকনো না থাকে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন তাঁর উম্মত অজুর কারণে উজ্জ্বল মুখমণ্ডল ও হাত-পা নিয়ে উপস্থিত হবে। তাই তিনি অজুর অঙ্গগুলো নির্ধারিত সীমার সামান্য বাইরে পর্যন্ত ধোয়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। এটি অজুর ফজিলতেরই একটি বিশেষ দিক।
অজু শেষে তিনি আল্লাহর একত্ব ও নবীজি (সা.)-এর রিসালাতের সাক্ষ্যবিষয়ক দোয়া পড়তেন। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে এই দোয়া পড়বে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। এছাড়া তওবা, পবিত্রতা ও ক্ষমা প্রার্থনার আরও কয়েকটি দোয়াও তিনি শিক্ষা দিয়েছেন।
সুন্নত অনুসরণের গুরুত্ব
অজু এমন একটি ইবাদত, যা প্রতিদিন বহুবার করার সুযোগ হয়। তাই প্রতিবার অজুকে সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পন্ন করলে একজন মুসলমান নিয়মিত সওয়াব অর্জন করতে পারেন। অল্প পানিতে, অপচয় এড়িয়ে, ধৈর্য ও যত্নের সঙ্গে অজু করা শুধু সুন্নাহই নয়, এটি ইসলামের সৌন্দর্য ও ভারসাম্যেরও প্রতিফলন।
অজুর মাধ্যমে একজন মানুষ কেবল শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিষ্কার করেন না, বরং তিনি নিজেকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করেন। তাই অজুকে কেবল একটি দৈনন্দিন অভ্যাস হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে দেখা উচিত।
নবীজি (সা.)-এর দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করে অজু করলে তা যেমন : সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় হয়, তেমনি একজন মুমিনের জীবনে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা, সংযম ও তাকওয়ার চর্চাও গড়ে ওঠে। এ কারণেই প্রতিটি মুসলমানের উচিত অজুর সুন্নতগুলো জানা এবং দৈনন্দিন জীবনে সেগুলোর বাস্তব অনুশীলন করা।
সময়ের আলো/এসএকে