ভিডিওকাণ্ডে জামায়াত নেতা বহিষ্কার, সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সারাদেশ

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র

2026-07-24T15:47:19+00:00
2026-07-24T16:23:26+00:00
 
  শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ভিডিওকাণ্ডে জামায়াত নেতা বহিষ্কার, সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:৪৭ পিএম  আপডেট: ২৪.০৭.২০২৬ ৪:২৩ পিএম
গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

গত সোমবার রাতে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়। শুরুতে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হলেও, পরদিন তিনি নিজের ফেসবুক পেজে জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। গত ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিক আয়োজনে তাদের বিয়ে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে তার এই ব্যাখ্যায় বিতর্ক থামেনি; বরং বিয়ে, ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, বিভিন্ন নথি ও বক্তব্যে অসংগতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।


ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে জামায়াতের খুলনা অঞ্চলের পরিচালক ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রে জমা দেওয়ার পর, গত বুধবার দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দলীয় এই সিদ্ধান্তের পর সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ৯৭টি কেন্দ্রের ফলাফলে ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মো. মনিরুজ্জামান পান ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল ২১ হাজার ৪৮৭। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় সংসদ সদস্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে।


জামায়াতের দলীয় সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন উঠেছে—এই আসনে কি উপনির্বাচন হবে? দলীয় সিদ্ধান্তের কথা নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলেও, সাংবিধানিকভাবে শুধু দল থেকে বহিষ্কারের কারণেই সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় কি না, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আইনি ভিত্তি তৈরি হয় দলগত কাঠামোর ওপর। তাই দল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করে এবং তার মনোনয়ন প্রত্যাহার বা বাতিল করে, তবে তার আসন শূন্য হওয়াটাই স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রথমবারের মতো এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সে সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি থেকে কিশোরগঞ্জ-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামানকে বহিষ্কার করা হয়। তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ওই পদ শূন্য ঘোষণার জন্য স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠালে শুনানির মাধ্যমে আখতারুজ্জামানের আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।

অনুরূপভাবে ২০১৫ সালে টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও তৎকালীন মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করলে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিষয়টি স্পিকারকে অবহিত করেন। স্পিকার তা নির্বাচন কমিশনে পাঠালে উভয় পক্ষকে শুনানিতে ডাকা হয়। তবে ইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই লতিফ সিদ্দিকী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।


‘সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন ১৯৮০’ অনুযায়ী, স্পিকার কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়া সংক্রান্ত বিতর্কিত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে পাঠালে, ইসি ১৪ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে অবহিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বক্তব্য আহ্বান করে। এরপর দুপক্ষের শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত দেয় কমিশন।

তবে সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো দল যদি কোনো এমপিকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ বহিষ্কার করে স্পিকারের কাছে পদ বাতিলের আবেদন করে, তবে পদ বাতিলের নজির রয়েছে। কিন্তু শুধু সাংগঠনিক পদ বাতিল করে স্পিকারের কাছে আবেদন না করলে পদ বাতিলের সম্ভাবনা কম। যেমন— নবম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি এইচ এম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও স্পিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোয় তার সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল।

অন্যদিকে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে যদি দল হতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তবে সংসদে তার আসন শূন্য হবে। তবে সে কারণে তিনি পরবর্তী নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না। এ ছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে কোনো এমপি অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তার পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়।

তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই পদত্যাগ করতে পারেন।


সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছি। জামায়াতে ইসলামী নৈতিকতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে কখনো আপস করে না। একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো দল নেবে না। দল ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলেই দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উপনির্বাচন হলে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পুনরায় জনগণের কাছে যাবেন। নৈতিক অবস্থান নেওয়ায় জনগণ তাদের ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে স্থানীয় সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা মনে করেন, এই ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, সাতক্ষীরায় জামায়াতের একটি শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনীতি করা কোনো দলের প্রতিনিধির কাছ থেকে এমন বিতর্ক মানুষ প্রত্যাশা করে না। যদি উপনির্বাচন হয়, তবে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পারে।


সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিগত নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পুরো এলাকার মানুষ লজ্জিত। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষে আসন শূন্য হলে এবং দল মনোনয়ন দিলে আমি অবশ্যই নির্বাচন করব। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ সঠিক রায় দেবে।

সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু মন্তব্য করেন, এই ঘটনা জামায়াতের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে এবং সুষ্ঠু পরিবেশে উপনির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।

আইনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচন হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মাথায় একজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিতর্ক, দলীয় বহিষ্কার এবং উপনির্বাচনের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের রাজনীতি এখন এক নতুন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   ভিডিও কাণ্ডে  জামায়াত নেতা  নজরুল  বহিষ্কার  সাতক্ষীরা  উপনির্বাচন  আলোচনা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: