ভারতের চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তির একমাত্র জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং অনিয়মের অভিযোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জওহর সুরিসেট্টির মতে, নিট-এর সংকট শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাষায়, পরীক্ষাটি এমন সাতটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি, যা প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে।
একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা অবশ্যই জরুরি। তবে পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় কোচিংনির্ভর প্রস্তুতি, সুযোগের বৈষম্য, পরীক্ষার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষাবর্ষ থেকে ঝরে পড়া সংস্কৃতি, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের অভাব, স্বাস্থ্যখাতে জনবল পরিকল্পনার ঘাটতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকট— এসব সমস্যাও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
কোচিং শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা
সুরিসেট্টির মতে, নিটকে ঘিরে বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার একটি কোচিং শিল্প গড়ে উঠেছে। যদিও পরীক্ষাটি এনসিইআরটি পাঠ্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়, বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য ব্যয়বহুল কোচিং ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি দাবি করেন, সাধারণ বিভাগের অনেক সফল পরীক্ষার্থী প্রস্তুতির জন্য ৮ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেন। এর ফলে পরীক্ষাটি কেবল মেধার নয়, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যেরও প্রতিফলন ঘটায়।
প্রবন্ধে রাজস্থানের কোটা শহরের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, সেখানে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা, কঠোর প্রতিযোগিতা এবং মানসিক চাপ বহু শিক্ষার্থীকে হতাশা ও আত্মহত্যার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ভালো চিকিৎসক বাছাইয়ে বর্তমান পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা
লেখকের মতে, বর্তমান নিট মূলত মুখস্থবিদ্যা, তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বহু নির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দক্ষতা যাচাই করে।
কিন্তু একজন দক্ষ চিকিৎসকের জন্য শুধু একাডেমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহমর্মিতা, ক্লিনিক্যাল বিচারবোধ এবং জটিল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যের ইউসিএটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমসিএটি পরীক্ষায় এসব দক্ষতার মূল্যায়নের জন্য আলাদা অংশ রয়েছে। তার প্রস্তাব, ভারতে দুই ধাপের নিট চালু করা যেতে পারে, যেখানে দ্বিতীয় ধাপে প্রার্থীদের নৈতিক বিচার, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে।
গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য
সুরিসেট্টি মনে করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার মানে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। অন্যদিকে শহরের শিক্ষার্থীরা উন্নত কোচিং, অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করে প্রস্তুতি নেন।
তার মতে, এই দুই ধরনের শিক্ষার্থীকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হলে প্রকৃত মেধার পরিবর্তে সুযোগ-সুবিধার পার্থক্যই বেশি প্রতিফলিত হয়।
ভাষাগত বৈষম্যের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন। তার দাবি, বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক ভাষার প্রশ্নপত্রে অনুবাদগত ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে, যা মাতৃভাষায় পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অসুবিধা তৈরি করেছে।
ঝরে পড়া সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞের মতে, প্রতি বছর নিট-এ উত্তীর্ণদের একটি বড় অংশ পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী। ফলে লাখো তরুণ একাধিক বছর শুধুমাত্র এই পরীক্ষার প্রস্তুতিতেই ব্যয় করছেন।
তিনি বলেন, এ সময়ে তারা উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা অন্য কোনো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এতে শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও ক্ষতি হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি সর্বোচ্চ তিনবার নিট পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নির্ধারণ এবং যারা সফল হবে না তাদের জন্য জীববিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য, বায়োটেকনোলজি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিকল্প শিক্ষার পথ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন।
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ঘাটতি
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পেশাদার ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ পান না। ফলে অনেকেই নিট-ই একমাত্র পথ মনে করে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় করেন।
লেখকের মতে, শিক্ষার্থীদের ফলাফল, পারিবারিক আর্থিক অবস্থা এবং আগ্রহ বিবেচনায় বিকল্প ক্যারিয়ারের পরামর্শ দিতে একটি জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল গাইডেন্স প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতে বহুমুখী জনবল তৈরির প্রয়োজন
সুরিসেট্টি বলেন, ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, রেডিওগ্রাফার, ফিজিশিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারসহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও জরুরি।
তার প্রস্তাব, এসব পেশার জন্য পৃথক জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা এবং স্বতন্ত্র ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করা উচিত, যাতে এগুলোও সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের আহ্বান
প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা এবং ব্যর্থতার কারণে বিপুলসংখ্যক নিট পরীক্ষার্থী মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। অথচ তাদের জন্য বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এখনও সীমিত।
এ পরিস্থিতিতে লেখক ২৪ ঘণ্টার বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বড় কোচিং প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক কাউন্সেলর নিয়োগ এবং জেলা পর্যায়ে পরীক্ষার্থীদের জন্য ওয়েলনেস সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সামগ্রিক সংস্কারের আহ্বান
জওহর সুরিসেট্টির মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি নিট-এর সামগ্রিক সংকটের একমাত্র সমাধান নয়। তার মতে, পরীক্ষার কাঠামো, শিক্ষার সমান সুযোগ, বিকল্প ক্যারিয়ার, স্বাস্থ্যখাতের জনবল পরিকল্পনা এবং পরীক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা— এসব বিষয়ে সমন্বিত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ