যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় ‘পকেট শহর’ হয়েই রয়ে গেল গাইবান্ধা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে রংপুরের পথে যাত্রা করলে গাইবান্ধায় নামতে হয় মূল মহাসড়ক ছেড়ে আরও প্রায় ২০ কিলোমিটার ভেতরে

2026-07-24T18:58:59+00:00
2026-07-24T18:58:59+00:00
 
  শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় ‘পকেট শহর’ হয়েই রয়ে গেল গাইবান্ধা
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৮ পিএম 
গাইবান্ধা শহর। সংগৃহীত ছবি
ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে রংপুরের পথে যাত্রা করলে গাইবান্ধায় নামতে হয় মূল মহাসড়ক ছেড়ে আরও প্রায় ২০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে। এই বিচ্যুতিটুকুই যেন প্রতীকী- গাইবান্ধা যেন মূল স্রোত থেকে দূরে থাকা এক জনপদ, যাকে স্থানীয়রা নিজেরাই ডাকেন ‘পকেট শহর’ নামে। প্রশ্ন হলো, প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এই জনপদ কেন আজও এই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে পারল না?

উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের দিকে। ঘাঘট, তিস্তা আর যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে গড়ে ওঠা এই ভূমি একসময় ছিল জমজমাট নদীবন্দর-নির্ভর জনপদ, যেখানে বৌদ্ধ, হিন্দু, মুঘল, পাঠান আর ইংরেজ শাসনের স্মৃতিচিহ্ন মিলেমিশে আছে। 

কিংবদন্তি বলে, পাঁচ হাজার বছর আগে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানী ছিল আজকের গোবিন্দগঞ্জে আর ১৮৭৩ সালে রংপুরের তৎকালীন কালেক্টর ই.জি. গ্লেজিয়ারের প্রতিবেদনেও ঠাঁই পেয়েছিল ঘাঘটপাড়ের এই জনপদের নাম। কিন্তু নদীপথ যখন গুরুত্ব হারাল, আর মহাসড়ক তৈরি হলো অন্য পথ ধরে, তখন থেকেই যেন গাইবান্ধার গল্পটা বদলে গেল যোগাযোগ বঞ্চনার গল্পে।

গাইবান্ধা মহকুমা হয় ১৮৫৮ সালে, জেলার মর্যাদা পায় ১৯৮৪ সালে। লেখক ও গবেষক অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুমের বলেন, ১৯৮৪ সালে যেসব মহকুমা একই সঙ্গে জেলা হয়েছিল, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা অবকাঠামো- সবক্ষেত্রেই সেগুলো গাইবান্ধাকে ছাড়িয়ে গেছে বহু আগে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জেলা শহরের ১০০ শয্যার হাসপাতাল ইতোমধ্যে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে জনবল ও অবকাঠামোসহ। 

গাইবান্ধার হাসপাতালের নামফলকে ‘২৫০ শয্যা’ লেখা থাকলেও ভেতরে চলছে সেই পুরোনো ১০০ শয্যার জনবল আর ব্যবস্থাপনায়। অনেক জেলায় মেডিকেল কলেজ হয়েছে, হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়- গাইবান্ধায় এর কোনোটিই এখনো বাস্তবতা পায়নি।

নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগ গাইবান্ধার সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তীর ব্যাখ্যায় উঠে আসে পিছিয়ে পড়ার শিকড়। একসময় নদীপথ ছিল গাইবান্ধার প্রাণ, জমজমাট ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। গত শতকের ষাটের দশকে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক নির্মিত হওয়ার পর নদীপথের গুরুত্ব কমতে থাকে আর গাইবান্ধা পড়ে যায় মহাসড়ক থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন এক অবস্থানে। স্বাধীনতার পর রেল যোগাযোগও ক্রমশ দুর্বল হয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছে একাধিক ট্রেন। এই দ্বিমুখী বিচ্ছিন্নতা থেকে এখনো বের হতে পারেনি জেলাটি।

এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাণিজ্যে। গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. সামিউল হুদা সুমেলের ভাষায়, শহরের ব্যবসা মূলত ডিবি রোড ও স্টেশন রোডকেন্দ্রিক দোকানপাটেই সীমাবদ্ধ। সাধারণত জেলা শহরে বড় পাইকারি বাজার থাকে, উপজেলার খুচরা ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে মালামাল কেনেন- গাইবান্ধায় ঘটে ঠিক উল্টোটা। মহাসড়ঘেঁষা গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে গড়ে উঠেছে বড় বড় ব্যবসা, ব্যাংকের শাখা, প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্র আর পাইকারি বাজার; গাইবান্ধা শহরের খুচরা বিক্রেতারা উল্টো সেখান থেকে মাল আনেন। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী জেলায় প্রায় দেড় লাখ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও এ দিক থেকেও এগিয়ে সদর নয়, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা।

মঙ্গার জনপদ হিসেবে একসময়ের পরিচিত এই জেলা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ধান এখান থেকে বাইরে যায়; সঙ্গে বাড়ছে ভুট্টা ও কলার চাষ। কিন্তু কৃষিপণ্যনির্ভর এই অর্থনীতিকে পিছিয়ে রাখছে যোগাযোগ খরচ। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, জেলার অন্য উপজেলার তুলনায় ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় এক ট্রাক পণ্য আনা-নেওয়ায় বাড়তি তিন থেকে চার হাজার টাকা গুনতে হয়- যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে ভোক্তার পকেটে।

শিল্পের নামে যা কিছু আছে, তা-ও পুঁজি সংকটে ধুঁকছে। জেলা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবুর বলেন, ব্যাংকঋণ পাওয়া এখানে ঝক্কির কাজ, আর সেই ফাঁক গলেই ফুলেফেঁপে উঠেছে ব্যক্তিপর্যায়ের সুদের কারবার। ঝুঁকি নিয়ে কারখানা বা নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার চেয়ে সহজ সুদের ব্যবসাই বেছে নিচ্ছেন অনেকে।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকল ছিল জেলার একমাত্র বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের নভেম্বরে দেশের ১৫টি রাষ্ট্রীয় চিনিকলের মধ্যে ছয়টির আখমাড়াই বন্ধের সিদ্ধান্তের তালিকায় ছিল এটিও। মাড়াই বন্ধ থাকায় গাইবান্ধার আখচাষিরা বাধ্য হয়ে ফসল পাঠিয়েছেন পাশের জয়পুরহাট চিনিকলে, যাতে বাড়তি পরিবহন-ঝক্কি ও দামের বৈষম্যে পড়তে হয়েছে তাঁদের। প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকা এই কারখানাকে ঘিরে এখনো হাজারো শ্রমিক-চাষির জীবিকা আটকা- দীর্ঘদিন অচল থাকায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতিও।

সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর কথা বললেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনাগ্রহে বরাদ্দ আটকে আছে, ফলে ঘোষণার পরও বাস্তবে অগ্রগতি সামান্য। স্থানীয় বাসিন্দারা তাই একযোগে দাবি তুলছেন, রংপুর চিনিকল আবার চালু হোক এবং গাইবান্ধায় গড়ে উঠুক কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল।

জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের একটি দাবি- ব্রহ্মপুত্রের ওপর বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু নির্মাণ। ফুলছড়ির বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত যমুনার ওপর এই সংযোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার সঙ্গে রাজধানীর দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়াধীন তালিকায় থাকলেও এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি; সম্প্রতি গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ প্রান্তে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করে দ্রুত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া রংপুর থেকে পীরগাছা-গাইবান্ধা হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন মহাসড়ক, গাইবান্ধা-সাদুল্লাপুর-বড় দরগা হয়ে রংপুর পর্যন্ত সরু সড়কটি প্রশস্ত করে আঞ্চলিক মহাসড়কে রূপান্তর এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণকেও জেলাবাসী দেখছেন বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে, যা ‘পকেট শহর’-এর দুর্নাম ঘোচাতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা স্পষ্ট- একটি কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল কলেজ, আর যোগাযোগব্যবস্থার সার্বিক উন্নতি। তরুণদের কণ্ঠে আবার প্রাধান্য পাচ্ছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। একজন শিক্ষার্থীর ভাষায়, আগামীর সরকারের কাছে তাঁদের চাওয়া- শিক্ষাব্যবস্থার মান বাড়ুক আর শিক্ষিত বেকারদের জন্য তৈরি হোক কর্মসংস্থানের সুযোগ।

গাইবান্ধার এই দীর্ঘদিনের পিছিয়ে পড়া অবস্থা ঘোচাতে যোগাযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে একযোগে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবার আগে প্রয়োজন যমুনার ওপর বহুল প্রতীক্ষিত বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু, যা নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ও বাণিজ্য গতিশীল হবে। এর পাশাপাশি জেলা সদরের সঙ্গে প্রত্যন্ত উপজেলা ও চরাঞ্চলের সংযোগ নিশ্চিত করতে উন্নত সড়ক নেটওয়ার্ক এবং প্রতি বছরের বন্যা-নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণও অপরিহার্য। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাবেষ্টিত চরাঞ্চলের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পৃথক ‘চর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠনের দাবিও দীর্ঘদিনের।

জেলায় একটি মানসম্মত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল কলেজ, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদর হাসপাতালকে প্রকৃত অর্থে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি উঠেছে। কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন ইপিজেড বা ছোট শিল্পাঞ্চল, যা রংপুর চিনিকলের মতো বন্ধ শিল্পের শূন্যতাও পূরণ করতে পারে। এর বাইরে পরিত্যক্ত ঘাঘট নদকে বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তর ও একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের দাবিও দীর্ঘদিনের।

এই উদ্যোগগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলেই নদীপথ হারানো, মহাসড়ক থেকে দূরে সরে যাওয়া এই প্রাচীন জনপদ তার বহুদিনের প্রতীক্ষার অবসান দেখতে পারবে।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   যোগাযোগ  বিচ্ছিন্নতা  পকেট শহর  গাইবান্ধা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: