রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এ পরিস্থিতিতে এখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু- কে হচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি?
প্রশ্নটি শুধু সাংবিধানিক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা এখন রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ নির্বাচন- উভয় দিক থেকেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও সরকারের অন্দরমহলে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে ৪ জনের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সার্বিক সমীকরণে দল ও দলের বাইরে পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম, যিনি বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। তবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এ ছাড়া একজন বিশিষ্ট নারীর নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা হাফিজ উদ্দিন আহমদই ভারমুক্ত হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এমন সম্ভাবনা প্রবল। এ ক্ষেত্রে স্পিকারের পদ শূন্য হলে সেই পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে নির্বাচিত করার সম্ভাবনা বেশি। সরকার-সংশ্লিষ্ট ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন এ বিষয়ে সরকারের শীর্ষ মহল নিশ্চিত হওয়ার পরপরই দেশের রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন তা নিয়ে বিএনপির উচ্চ মহলে আলোচনা হয়। আলোচনায় নতুন রাষ্ট্রপতির অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচনের বিষয়টিও উঠে আসে। সেখানে দলের শীর্ষ ৪ নেতার নাম আলোচনায় উঠে আসে।
এর বাইরে কয়েকজনের নাম আলোচিত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সব দিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি পদের জন্য স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদই উত্তম হবেন। এ ছাড়া স্পিকার পদের জন্য মঈন খানকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন তা চূড়ান্ত করবেন।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে অনেক দিন ধরেই মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় রয়েছে। দলের সবমহলে, এমনকি দলের বাইরেও তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। তিনি দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নিজে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী কি না সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এখনও কোনো দায়িত্ব পাননি। তখন স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে তাকে নির্বাচিত করা হতে পারে- রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনা শুরু হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারমুক্ত হয়ে রাষ্ট্রপতি হলে স্পিকার কে হবেন- এমন আলোচনায় আবারও মঈন খানের নাম সবার আগে আলোচিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুলের জীবনী : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও শপথ নেননি।
তিনি ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মির্জা রুহুল আমিন ও মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। শিক্ষাজীবনে মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।
পরে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহ-সভাপতির দয়িত্ব পালন করেন।
হাফিজ উদ্দিনের জীবনী : ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। মা মরহুমা করিমুন নেছা বেগম ছিলেন গৃহিণী। হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১৯৬৬ সালের ১ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে (অ্যান্টি ডেট) কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব বীর বিক্রম লাভ করেন।
তিনি ভোলা-৩ (লালমোহন ও তজমুদ্দিন) আসন থেকে মোট সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন (৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও ১৩তম সংসদ)। ১৯৯১ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী নরসিংদী-২ আসন থেকে প্রথমবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বিএনপির মন্ত্রিসভায় ১৯৯৬ সালে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে পানিসম্পদ, বাণিজ্য ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফুটবলার হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
আবদুল মঈন খানের জীবনী : ড. আবদুল মঈন খান ১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন।
তিনি বিএনপির রাজনীতিবিদ ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুল মোমেন খানের ছেলে। বাবার হাত ধরেই তার রাজনীতির সূচনা। তিনি ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। এর আগে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী (১৯৯৩-৯৬), তথ্যমন্ত্রী (২০০১-২০০২), বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী (২০০২-০৬) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও