রাত শেষ হতে না হতেই ঘুম ভেঙে যায় আহমদুল হকের (৭০)। অ্যালার্মে নয়, ভয়েই তার ঘুম ভাঙে। এরপর হাতে টর্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ধানের গোলার দিকে। প্রায় এক লাখ টাকার শুকনা ধান সেখানে রাখা। চোখ-কান খোলা রেখে পাহারা দেন। কারণ, যেকোনো মুহূর্তে লোকালয়ে নেমে আসতে পারে বন্যহাতির পাল।
বোয়ালখালীর ৮ নম্বর শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহৎবাড়ির এই বৃদ্ধ কৃষক বলেন, ভোরে আমার ঘরের সামনে দিয়েই হাতি হেঁটে গেছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে।
আহমদুল হকের মতো একই আতঙ্কে দিন কাটছে ফতেরখীল, জৈষ্ঠ্যপুরা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের। গত দুই মাস ধরে বন্যহাতির অবাধ বিচরণে এসব এলাকার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, আর ভোর হলেই কোথাও না কোথাও হাতির উপস্থিতির খবর মিলছে।
এ সময়ে হাতির তাণ্ডবে অন্তত ৪৮০ শতক জমির ধানের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় কৃষক লিটন বড়ুয়ার ধানের গোলা উল্টে দিয়ে প্রায় এক লাখ টাকার ধান খেয়ে ও নষ্ট করেছে হাতির পাল। একইভাবে আরও অনেক কৃষকের ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলমের বসতবাড়ির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে রাতে প্রবেশ করে হাতির দল। একই এলাকার জুনু মিয়ার ৪০ শতক আখক্ষেত তছনছ করে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এ ছাড়া বড়ুয়া পাড়ার বাসিন্দা দিলীপ বড়ুয়ার সুপেয় পানির নলকূপও ভেঙে ফেলে বন্য হাতি।
ফতেরখীল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বাদশা বলেন, দুই মাস ধরে বন্য হাতির কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ। একবারের জন্যও বন বিভাগের কেউ কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের যাতায়াত নিয়েও সবাই আতঙ্কে আছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা তাপস বড়ুয়া বলেন, মানুষের চলাচলের পথ দিয়েই হাতি যাতায়াত করছে। ভোরে মসজিদে নামাজে যাওয়া মুসল্লিদেরও হাতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আখক্ষেত, সবজি ও বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে হাতির পাল।
৮ নম্বর শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হাসানচৌধুরী বলেন, মসজিদে নামাজ, মন্দিরে পূজা কিংবা বিহারে দেশনায় যেতে মানুষ ভয় পাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই হাতি লোকালয়ে নেমে আসে, আবার ভোরেও দেখা যায়।
হাতিগুলো আক্রমণাত্মক হওয়ায় কেউ সামনে দাঁড়াতে পারে না। তাই স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষদের নিয়ে একটি ‘হাতি তাড়ানো কমিটি’ গঠন করা প্রয়োজন। বন বিভাগ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিলে হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলেই তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পটিয়া রেঞ্জের বন কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, বোয়ালখালী এলাকায় জনবল ও সক্ষমতা সীমিত। কর্মকর্তা কম থাকায় সব জায়গায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো কঠিন হচ্ছে। তবে বন্যহাতি তাড়ানোর কাজ নিয়মিত করা হচ্ছে। জ্যৈষ্ঠপুরা ও আশপাশের এলাকা হাতির স্বাভাবিক বিচরণভূমি হওয়ায় জনবল সংকটে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, লোকালয়ে বন্যহাতি আসার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। বিষয়টি মোকাবিলায় এলিফ্যান্ট রেসকিউ টিম কাজ করবে। হাতির আক্রমণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আবেদন সাপেক্ষে সরকারি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, বনাঞ্চলে খাবার ও আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় হাতি লোকালয়ে চলে আসছে। আগে যেসব এলাকায় খাবার পেয়েছে, উন্নত স্মৃতিশক্তির কারণে সেসব স্থানেই তারা বারবার ফিরে আসে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও