রঙিন তাবুতে আঁধার, অস্তিত্ব সংকটে সার্কাসশিল্প

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি

সারাদেশ

একসময় গ্রাম কিংবা শহরের মেলা মানেই ছিল বিশাল তাবু, রঙিন আলো, মাইকের ঘোষণা আর ঢোলের শব্দে মুখর চারপাশ। সন্ধ্যা নামলেই

2026-09-14T08:32:35+00:00
2026-09-14T09:28:21+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
রঙিন তাবুতে আঁধার, অস্তিত্ব সংকটে সার্কাসশিল্প
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩২ এএম  আপডেট: ১৪.০৯.২০২৬ ৯:২৮ এএম
সার্কাসশিল্প। ছবি : সময়ের আলো
একসময় গ্রাম কিংবা শহরের মেলা মানেই ছিল বিশাল তাবু, রঙিন আলো, মাইকের ঘোষণা আর ঢোলের শব্দে মুখর চারপাশ। সন্ধ্যা নামলেই পরিবার নিয়ে মেলায় ছুটে যেত মানুষ। কারও আগ্রহ দড়ির ওপর খেলোয়াড়ের ভারসাম্য দেখায়, কেউবা অপেক্ষা করতেন মোটরসাইকেলের ‘মৃত্যুকূপে’ রোমাঞ্চকর কসরত দেখার জন্য। শিশুদের চোখে থাকত বিস্ময়, বড়দের মনে ফিরত শৈশবের স্মৃতি।

কালের বিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টেছে, বেড়েছে নানা ধরনের বিকল্প আয়োজন। এর সঙ্গে অনুমতির জটিলতা, মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দর্শক সংকট এবং নাচগানের বাড়তি চাহিদায় সংকটে পড়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী সার্কাসশিল্প। একসময় দেশে ৪০ থেকে ৪২টি সার্কাস দল থাকলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ থেকে ১৮টিতে। এর মধ্যেও নিয়মিত সচল রয়েছে মাত্র ৫ থেকে ৬টি দল।

ঢাকার নবাবগঞ্জের ১২০ বছরেরও বেশি পুরোনো ‘দ্য লায়ন সার্কাস’ এখন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় তাবু গেড়েছে। একসময় যে সার্কাসের খেলা দেখতে দর্শকের ভিড় জমত, এখন সেই দলকেই টিকে থাকার জন্য নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।

দলটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত শিল্পী সুমন বলেন, মেলার অনুমতি পাওয়া গেলেও অনেক সময় বিনোদনের অনুমতি মেলে না। ফলে তাবু গেড়েও সার্কাস চালানো সম্ভব হয় না। আবার রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ছোটখাটো কোনো গোলযোগের কারণে মেলা বন্ধ হয়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সার্কাসশিল্পীদের জীবনে। দিনের পর দিন বসে থাকতে হয় কাজহীন।

শিল্পীদের জীবিকার অনিশ্চয়তার চিত্র আরও স্পষ্ট করেন ফরিদপুরের মধুখালীর সার্কাস খেলোয়াড় শুকলাল। তার ভাষ্য, একসময় বছরের প্রায় ১১ মাসই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সার্কাস দেখানোর সুযোগ মিলত। এখন নানা জটিলতায় ছয় মাসও নিয়মিত শো করা সম্ভব হয় না। এতে শুধু সাধারণ শ্রমিক নয়, দক্ষ খেলোয়াড়দের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সার্কাসের সংকট শুধু মাঠে খেলা আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দর্শকদের একাংশের চাহিদার কারণে ঐতিহ্যবাহী সার্কাসের পরিবর্তে নাচগানের প্রবণতা বেড়েছে। এতে মূল সার্কাস খেলার গুরুত্ব ও মান কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যে শিল্প একসময় দক্ষতা, সাহস ও শারীরিক কসরতের অনন্য প্রদর্শনী ছিল, সেখানে বাণিজ্যিক চাহিদার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সার্কাস বন্ধ থাকার প্রভাব পড়ছে শিল্পীদের পরিবারেও। নিয়মিত কাজ না থাকায় জীবিকার তাগিদে অনেকে পেশা বদল করছেন। কেউ পোশাক কারখানায় কাজ নিচ্ছেন, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন। ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে পেশা ও দক্ষতা চলে আসছিল, সেটিও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

১৫ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত কণ্ঠশিল্পী লিজা সরকার বলেন, বছরের বেশির ভাগ সময় কাজ না থাকায় নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসতে চাইছে না। তার ওপর আইনি জটিলতার কারণে বন্যপ্রাণীর প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার্কাসের বৈচিত্র্যও কমে গেছে।

তবু এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের আশা, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা পেলে সার্কাস আবারও দর্শক টানতে পারে। নিয়ম মেনে সার্কাস পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে হারানো ঐতিহ্যও ফিরে আসতে পারে।

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, সার্কাস মালিকরা সরাসরি যোগাযোগ করলে বিষয়টি বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।

তাবুর বাইরে হয়তো এখন আগের মতো মানুষের ভিড় নেই। মাইকের ঘোষণাও আগের মতো দূর থেকে শোনা যায় না। কিন্তু তাবুর ভেতরে এখনও অনুশীলন করেন দড়ির ওপর ভারসাম্য রাখা শিল্পী, ঝুঁকি নিয়ে কসরত দেখানো খেলোয়াড়রা। তাদের হাত ধরেই বেঁচে আছে এক পুরোনো বিনোদন ঐতিহ্য। প্রয়োজন শুধু টিকে থাকার মতো একটি সুযোগ— যাতে সার্কাসের রঙিন আলো পুরোপুরি নিভে না যায়।


সময়ের আলো/জোই/কেএইচ
  বিষয়:   সার্কাসশিল্প  পেশ বদলানো  শিল্পী  কষ্টের গল্প 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: