একসময় গ্রাম বা শহরের মেলা মানেই ছিল বিশাল তাবু, রঙিন আলো, মাইকের ঘোষণা আর ঢোলের শব্দে মুখর চারপাশ। সন্ধ্যা নামলেই পরিবার নিয়ে মানুষ ছুটে যেত দড়ির ওপর খেলোয়াড়ের ভারসাম্য কিংবা মোটরসাইকেলের মৃত্যুকূপের মতো রোমাঞ্চকর কসরত দেখতে।
তবে সময়ের বিবর্তনে মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। সেই সঙ্গে অনুমতির জটিলতা, মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দর্শক সংকট এবং অশ্লীল নাচগানের বাড়তি চাহিদার কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী সার্কাসশিল্প। একসময় দেশে ৪০ থেকে ৪২টি সার্কাস দল থাকলেও বর্তমানে তা কমে মাত্র ১৭ থেকে ১৮টিতে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে নিয়মিত সচল রয়েছে মাত্র ৫ থেকে ৬টি দল।
ঢাকার নবাবগঞ্জের ১২০ বছরেরও বেশি পুরনো ‘দ্য লায়ন সার্কাস’ বর্তমানে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় তাবু গেড়েছে। দলটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত শিল্পী সুমন জানান, মেলার অনুমতি মিললেও অনেক সময় বিনোদনের অনুমতি না পাওয়ায় সার্কাস চালানো যায় না। আবার রাজনৈতিক বিরোধ বা ছোটখাটো গোলযোগেও মেলা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে শিল্পীদের বেকার বসে থাকতে হয়।
ফরিদপুরের মধুখালীর সার্কাস খেলোয়াড় শুকলাল জানান, আগে বছরের প্রায় ১১ মাসই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খেলা দেখানোর সুযোগ মিললেও বর্তমানে নানা জটিলতায় ৬ মাসও শো করা সম্ভব হয় না। এতে সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি দক্ষ খেলোয়াড়দের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া দর্শকদের একটি অংশের চাহিদার কারণে মূল সার্কাস খেলার চেয়ে নাচগানের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় খেলার মান ও ঐতিহ্য মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সার্কাস বন্ধ থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্পীদের পরিবারে। জীবিকার তাগিদে অনেকে এই পেশা ছেড়ে পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস) কিংবা অটোরিকশা চালানোর মতো ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন। ১৫ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত কণ্ঠশিল্পী লিজা সরকার জানান, বছরের বেশির ভাগ সময় কাজ না থাকায় নতুন প্রজন্মকে কেউ এই পেশায় আনতে চাচ্ছেন না। পাশাপাশি আইনি জটিলতায় বন্যপ্রাণীর প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার্কাসের বৈচিত্র্যও কমে গেছে।
তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ম মেনে সার্কাস পরিচালনার সুযোগ পেলে এই শিল্প হারানো জৌলুশ ফিরে পাবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে শেরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু জানান, সার্কাস মালিকরা সরাসরি যোগাযোগ করলে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
সময়ের আলো/জোই