ঢেউ থামেনি ভূমধ্যসাগরের। থামেনি ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নও। কিন্তু সেই স্বপ্নের বিনিময়ে বাংলাদেশের অনেক পরিবারের উঠানে এখন শুধু অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর শোক। কেউ আট মাস ধরে নিখোঁজ ছেলের ফেরার আশায় দিন গুনছেন, কেউ আবার উদ্ধার হওয়া এক তরুণের ফোনে জানতে পেরেছেন- তার সন্তান আর ফিরবে না। হবিগঞ্জের কয়েকটি গ্রামের মানুষের কাছে ইউরোপের পথ এখন আর কেবল বিদেশযাত্রার গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে নিখোঁজ মানুষের তালিকা, দালাল চক্রের প্রতারণা এবং ভূমধ্যসাগরের অতলে হারিয়ে যাওয়া জীবনের নির্মম দলিল।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপোলি উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকায় থাকা হবিগঞ্জের অন্তত ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ আরোহীর কোনো সন্ধান মেলেনি আজও। এরই মধ্যে চলতি বছরের জুনে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে আরেকটি রাবারের নৌকা ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন চার বাংলাদেশি। ওই নৌকায় ৪৬ জন আরোহী ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি।
নিখোঁজদের মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া একজন হলেন হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সীমা সরকারের ছেলে নিবিড় সরকার অভি। অন্যরা হলেন- সিলেটের বকুল ঋষি, রংপুরের সালাউদ্দিন এবং বরিশালের জিয়াউর রহমান।
এ ঘটনায় উদ্ধার হয়েছেন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের সামাদ তালুকদারের ছেলে ফাহিম তালুকদার, নূর আলী তালুকদারের ছেলে সানি তালুকদার এবং ইউসুফ তালুকদারের ছেলে আবু বকর তালুকদার। গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় তারা প্রত্যেকে দালাল চক্রকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। উদ্ধার হওয়া আবু বকর তালুকদার বর্তমানে গ্রিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মোবাইল ফোনে তিনি জানান, গত ৭ জুন লিবিয়ার উপকূল থেকে ৪৬ জন আরোহী নিয়ে একটি রাবারের নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রায় ৮৩ কিলোমিটার আগে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এরপর টানা ১১ দিন তারা সাগরে ভাসতে থাকেন। ১৮ জুন গ্রিসের কোস্ট গার্ড উদ্ধার অভিযান শুরু করলে আতঙ্কে সবাই নৌকার এক পাশে জড়ো হয়ে পড়েন। এতে বাতাস দিয়ে ফোলানো নৌকাটি ভারসাম্য হারিয়ে ডুবে যায়। চার বাংলাদেশিসহ ছয়জন সাগরে তলিয়ে যান।
নিখোঁজ অভির মামা বিপ্লব সরকার জানান, ছেলে হারানোর শোকে অভির মা সীমা সরকার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দালালরা কাঠের নৌকায় পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত রাবারের নৌকায় পাঠানো হয়। যাত্রার পর পরিবারকে জানানো হয়েছিল, অভি নিরাপদে গ্রিসে পৌঁছেছেন। সেই বিশ্বাসে দালালদের ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। পরে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণের পর জানা যায়, অভি আর বেঁচে নেই।
নতুন এই ট্র্যাজেডির মধ্যেই এখনও অমীমাংসিত রয়েছে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের নিখোঁজের ঘটনা। সেদিন লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে ইতালির উদ্দেশে চারটি নৌকা রওনা দেয়। তিনটি নৌকা নিরাপদে পৌঁছালেও একটি নৌকার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই নৌকায় হবিগঞ্জের অন্তত ৩৮ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে হবিগঞ্জ সদর, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা রয়েছেন।
বাংলাদেশ দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এবং সম্ভাব্য ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে খোঁজ নিয়েও তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব মো. রাসেল মিয়া বলেন, অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করায় এসব ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে থাকে না। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেওয়া হলেও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার ধারণা, নিখোঁজ ব্যক্তিরা ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা গেছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়াপ্রবাসী হাসান মোল্লার মাধ্যমে অনেক তরুণ ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গত আট মাসে অন্তত ৭৫০ জনকে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পাঠানোর দাবি করে হাসান মোল্লার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় মানব পাচার, হত্যা এবং মরদেহ গুমের অভিযোগে বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও অভিযোগে উল্লেখিত মূল হোতারা এখনও অধরা।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক খান বলেন, দায়ের হওয়া তিনটি মামলার তদন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলছে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল অপরাধীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে মানব পাচার প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, দুটি ঘটনার বিষয়ে তিনি প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও