নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের নাহারখিল গ্রামের মো. হারুনুর রশিদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ইয়াবা সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় তিনি অনেকটা প্রকাশ্যেই এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, অভিযুক্ত মো. হারুনুর রশিদ নাহারখিল গ্রামের নোয়াব আলী ব্যাপারী বাড়ির বাসিন্দা। তার পিতার নাম সরাপত আলী।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় ইয়াবা সেবন ও কেনাবেচার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, হারুনুর রশিদ শুধু ইয়াবা সেবনই করেন না, এর কেনাবেচা ও সরবরাহের সঙ্গেও জড়িত। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করার পাশাপাশি অভিযোগের সমর্থনে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং আইনগতভাবে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, কয়েক বছর আগে ঢাকায় মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হারুনুর রশিদ। পরবর্তীতে মাদক সেবন ও বিক্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আদালতের মাধ্যমে তাঁর কারাদণ্ড হয়েছিল বলেও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ওই মামলায় সাজা ভোগ করে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর হারুনুর রশিদ পুনরায় নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর আবারও মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাহারখিল গ্রামে অবস্থিত সরকার দলীয় স্থানীয় এক নেতার মালিকানাধীন ইটভাটায় চাকরি করার সুবাদে হারুনুর রশিদ ওই নেতার রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয়রা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে ভয় পান বলেও কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদকের ভয়াল বিস্তার থেকে এলাকার যুব সমাজকে রক্ষা করতে স্থানীয় মসজিদের ইমাম, মুসল্লি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় হারুনুর রশিদকে মাদক সেবন ও এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য নিষেধ করেছেন। কিন্তু এসব নিষেধ উপেক্ষা করেই তিনি মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রির মতো কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে তরুণ প্রজন্মের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করা হলেও দৃশ্যমানভাবে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে শুধু নাহারখিল গ্রাম নয়, পুরো চাটখিল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। এলাকাবাসীর দাবি, নাহারখিল গ্রামসহ চাটখিল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কোনোভাবেই মাদকসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকের মূল উৎস ও সরবরাহকারীদেরও চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাদকের ব্যপারে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে চাটখিল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
তবে ধারাবাহিক অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি মাদক ব্যবসার মূলহোতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করে মাদক ব্যবসা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনবে প্রশাসন। একই সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মাদকের বিস্তার থেকে এলাকার যুব সমাজকে রক্ষা এবং চাটখিলকে মাদকমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
অভিযোগ অস্বীকার করে মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষ। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। কারও ছত্রছায়ায় থেকে কোনো মাদক ব্যবসাও করছি না। কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করলে নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিতে হবে। কেউ যদি কোনো প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে আমি সব মেনে নেব।’
চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফিরোজ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘হারুনুর রশিদের ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। আমরা নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছি। তবে ব্যাটে বলে মিলছে না। উপযুক্ত প্রমাণ পেলেই তাকে গ্রেফতার করব।’
তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। অভিযুক্তদের দ্রুতই গ্রেফতারে সক্ষম হব বলে আশা করছি।’
সময়ের আলো/কেএইচও