পূর্বাচলে ভিটে গেছে, এবার কি মায়ের কবরও যাবে?

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

সারাদেশ

তিন দশক আগে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের জন্য ভিটেমাটি হারিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। নতুন জায়গায় ঘর তুলে কোনোমতে জীবন

2026-07-26T00:50:40+00:00
2026-07-26T00:50:40+00:00
 
  রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পূর্বাচলে ভিটে গেছে, এবার কি মায়ের কবরও যাবে?
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫০ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
তিন দশক আগে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের জন্য ভিটেমাটি হারিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। নতুন জায়গায় ঘর তুলে কোনোমতে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার পর আবারও জমি অধিগ্রহণের শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। সবচেয়ে বড় ভয়, এবার শুধু বসতভিটা নয়, হারিয়ে যেতে পারে প্রিয়জনের কবরও। সেই আশঙ্কায় প্রশ্ন তুলছেন বাসিন্দারা, ‘পূর্বাচলে ভিটে গেছে, এবার কি মায়ের কবরও যাবে?’

ফুলবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা কাজী মাজহারুল আনোয়ার বাড়ির উঠানে পাশাপাশি থাকা মা ও ভাইয়ের কবরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘পূর্বাচলে আমার দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সেগুলো ভেঙে প্লট করা হয়েছে। এখন কি আমার মায়ের কবরেরও একই পরিণতি হবে?’

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সরকারি সংস্থা বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রঘুরামপুর, ব্রাহ্মণখালী ও কুলাদি মৌজার প্রায় ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে অন্তত ২০০ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ।

শনিবার সরেজমিনে দাউদপুর ইউনিয়নের চারটি মৌজা ঘুরে দেখা যায়, পুরো এলাকায় চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মুখে একটাই প্রশ্ন—একবার সরকারি প্রকল্পের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার পর আবারও কি তাঁদের উচ্ছেদ হতে হবে?

বাসিন্দারা জানান, নব্বইয়ের দশকে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের জন্য তাঁদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। অনেকেই নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। পরে নতুন জায়গায় ঘরবাড়ি নির্মাণ করে কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করেন। তিন দশক পর সেই নতুন ঠিকানাও আবার অনিশ্চয়তার মুখে।

তাঁদের দাবি, গত এক মাসে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল কয়েক দফা এলাকায় এসে সার্ভে করেছে। সংস্থাটির পরিকল্পনা বিভাগের এক কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ভূমির তফসিল থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, রঘুরামপুর মৌজায় ১৯ দশমিক ২১ একর, ব্রাহ্মণখালীতে ১৫ দশমিক ৮৫ একর এবং কুলাদিতে ৩ দশমিক ৭০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই গোপনে সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের ক্ষতিপূরণ দিয়ে বর্তমান বাজারে অন্যত্র সমপরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হবে না। ফলে তাঁরা একদিকে বসতভিটা, অন্যদিকে জীবিকার প্রধান উৎস কৃষিজমিও হারাবেন।

পূর্বাচল প্রকল্পে একবার উচ্ছেদ হওয়া সায়েম ভূইয়া বলেন, ‘একবার পূর্বাচল থেকে উচ্ছেদ করছে, আবারও উচ্ছেদ করার চেষ্টা করতাছে। আমরা কি মানুষ না?’

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় প্রায় ২০০ পরিবার থাকে। শতাধিক মানুষের কবর আছে। ভোটার প্রায় ১৬শ। এরা কোথায় যাবে? কীভাবে বাঁচবে?’

নজরুল ইসলাম মোল্লার আক্ষেপ, ‘উপশহর থেইকা খেদাইয়া দিছে। বাইরে আইয়া বাড়ি করলাম। এখন আবার উচ্ছেদের কথা শুনতেছি। আমরা আর কোথায় যামু?’

কৃষকদের ভাষ্য, এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। জমি হারালে শুধু বসতভিটাই নয়, তাঁদের আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যাবে।

কাজী মাজহারুল আনোয়ার জানান, পূর্বাচলে ভিটেমাটি হারিয়ে রঘুরামপুরে প্রায় পাঁচ শতক জমির ওপর নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। এখন সেই বাড়িটিও অধিগ্রহণের তালিকায় পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা কেমন রাষ্ট্রে বাস করি, যে রাষ্ট্র আমাদের বাসস্থানের নিরাপত্তা দিতে পারে না। আমরা কী এই দেশের নাগরিক, নাকি রোহিঙ্গা?’


মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, ‘আমার দাদা-নানার কবর পূর্বাচলে ছিল, সেগুলোও আর নেই। এখন যদি মায়ের কবরও চলে যায়, আমি জিয়ারত করব কীভাবে?’

আনোয়ারের ছোট ছেলে, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী কাজী রাফিনও শঙ্কিত। তার প্রশ্ন, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হলে তার পড়াশোনা কীভাবে চলবে?

শিমুলিয়া গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল মতিন বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে উচ্ছেদ করলে ওই টাকা দিয়ে অন্য কোথাও এক টুকরো জমিও কেনা সম্ভব নয়।’

স্থানীয়দের দাবি, প্রস্তাবিত অধিগ্রহণ কার্যকর হলে কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মৌজাগুলোতে ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৬০০-এর বেশি। তাঁদের আশঙ্কা, অধিগ্রহণ বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্থায়ী ঠিকানা ও নাগরিক জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

এলাকায় সার্ভে টিমের আনাগোনা বাড়ার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ইতোমধ্যে নারী-পুরুষ ও যুবকদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। তাঁদের ঘোষণা, প্রয়োজনে আন্দোলনে নামলেও পৈতৃক ভিটেমাটি ছাড়বেন না।

তাঁদের দাবি, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ না করে সরকারি খাসজমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বসতভিটা ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ আল সোহান বলেন, প্রায় এক মাস আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার চাইলে আইন অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।’

কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   পূর্বাচল  ভিটে গেছে  মায়ের কবরও যাবে  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: