দামি ইলিশ বেচেও পকেট ফাঁকা

চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা

সারাদেশ

‘চার দিন আগে পাঁচজন মাঝি-মাল্লা লইয়া নদীতে নামছিলাম। যে মাছ পাইছি, তা ৬৬ হাজার টাকায় বেচছি। কিন্তু সেই টাকার সিংহভাগই

2026-09-11T03:59:17+00:00
2026-09-11T03:59:17+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
দামি ইলিশ বেচেও পকেট ফাঁকা
দাদনের কিস্তিতে বন্দি হাজারো জেলে
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫৯ এএম 
ছবি: সময়ের আলো
‘চার দিন আগে পাঁচজন মাঝি-মাল্লা লইয়া নদীতে নামছিলাম। যে মাছ পাইছি, তা ৬৬ হাজার টাকায় বেচছি। কিন্তু সেই টাকার সিংহভাগই মহাজনের দাদনের কিস্তিতে চলে গেছে। পকেটে যা আছিল, তা দিয়া আবার চাল-ডাল কিনতে দেনা করতে হইছে।’ 

ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাটে নোঙর করা নৌকায় বসে রোদে শুকানো ইলিশের ছেঁড়া জাল সেলাই করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ৩২ বছর বয়সি জেলে আবদুল। চোখে-মুখে তার রাতজাগা ক্লান্তি আর দেনার দুশ্চিন্তা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার উত্তাল নদীতে জীবনবাজি রেখে যারা রুপালি ইলিশ তুলে আনেন, উপকূলের সেই হাজার হাজার জেলের জীবন কীভাবে মহাজনের কাছে বাঁধা পড়েছে— আবদুল যেন তারই এক বাস্তব রূপ। 

একই ঘাটে বসে জাল মেরামতের কাজ করা রফিক মাঝি (৪২), ইদ্রিস (৩৭), আব্বাস উদ্দিন (২৩) ও রত্তন মাঝির (৪৪) কণ্ঠেও ঝরল একই আক্ষেপ। নদী ও সাগরে ট্রলার নামছে, জালের টানে রুপালি ইলিশও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই মাছ জেলেদের জীবনে কোনো স্বস্তি আনছে না। বছরজুড়ে মহাজন ও আড়তদারদের দাদনের ভারী বোঝা বইতে গিয়ে উপকূলের হাজার হাজার পরিবার জিম্মি হয়ে পড়েছে।

মেঘনার পাড়ে বসা এক প্রবীণ জেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘নদী আর সাগরে ইলিশ মিললেও আমাগো কপালে দেনার খাতা চিরকাল খোলাই থাকে। আমরা সাগরে জীবনবাজি রাইখা মাছ ধরি ঠিকই, কিন্তু মহাজনের দাদনের দাসত্ব থাইকা আমাগো কোনো দিন মুক্তি মেলে না।’ উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছেন। এদের মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত ৪৪ হাজার ২৮১ জন এবং অনিবন্ধিত প্রায় ৪৬ হাজার। এ ছাড়া সমুদ্রগামী নিবন্ধিত ট্রলার রয়েছে ১ হাজার ৩৬৫টি। 

তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি যারা— সেই জেলেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না। ট্রলারের জাল কেনা, জ্বালানি ভরা কিংবা প্রজনন নিষেধাজ্ঞার সময়ে সংসার চালানোর নামে মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনই তাদের মূল সংকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দাদন নেওয়ার একমাত্র শর্ত— আড়তদারের নির্ধারণ করা দামে মাছ বিক্রি করতে হবে এবং আড়তদার কেটে নেবেন নির্ধারিত কমিশন। ফলে দিনশেষে জেলেদের হাতে কেবল পড়ে থাকে পরবর্তী খেপের জন্য আবার নতুন ঋণের সুযোগ। 


নদীতে আগের তুলনায় ইলিশ মিললেও দেনা শোধের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান সামরাজ ঘাটের কাশেম মাঝি (৫৬) ও কবির মাঝি (৪৫)। তারা জানান, দৈনন্দিন ট্রলার চালানোর খরচ আর আড়তদারের কিস্তি মেটানোর পর হাত খালিই থেকে যায়। 

জেলেদের এই জীবনযাত্রার বিপরীতে আড়তদারদের মুখে শোনা যায় ভিন্ন কথা। সামরাজ মৎস্যঘাটের আড়তদার হেলাল উদ্দিন টিপু দাবি করেন, সামরাজ ঘাটের ৯৮ জন আড়তদার প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে তেলের খরচ উঠলেও জেলেরা আড়তদারদের দাদন পরিশোধ করতে পারছে না। নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্থানীয় এক মৎস্যজীবী জানান, আড়তদারদের এই ‘মাছ না পাওয়া’ ও ‘লোকসানের’ তথ্য মূলত এক ধরনের কৌশল। একদিকে নদীতে মাছ থাকা সত্ত্বেও ঘাটে 

কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক তদারকি এড়াতে জেলেদের এই চিরন্তন দারিদ্র্য ও ঋণের চিত্রকে ঢাল বানানোর চেষ্টা করছেন আড়তদারদের একাংশ। মৎস্যঘাটগুলোতে শুধু জেলেদের ওপরই প্রভাব পড়ছে না, সাধারণ ক্রেতাদের ওপরও চলছে মনগড়া নিয়মের প্রভাব। 

মাইনউদ্দিন মৎস্যঘাটে ইলিশ কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভরা মৌসুমেও এক হালি মাঝারি ইলিশ সাত হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ। আড়তদাররা নানা অজুহাতে ইচ্ছামতো দাম হাঁকিয়ে ডাক তোলেন। এর ওপর ইলিশে ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য মাছে ১৫ শতাংশ কমিশন আদায় করেন। ক্রেতারা তো দাদন নেননি, তা হলে ক্রেতার কাছ থেকে কেন কমিশন নেওয়া হবে? এই অনিয়মের কোনো নিয়ন্ত্রণ কারও হাতে নেই।’ 

চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু জানান, বৃষ্টিপাত হওয়ায় ইলিশ মিলছে, তবে বাজারে দাম চড়া। আড়তদারদের কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলেদের দাদন দেওয়ার কারণে হয়তো আড়তদাররা তাদের কাছ থেকে কমিশন নেন। তবে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকেও কমিশন নেওয়ার বিষয়টি জানা ছিল না। এ বিষয়ে মৎস্যঘাটের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   ইলিশ  পকেট ফাঁকা  সময়ের আলো  ভোলা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: