মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় সরকারি তালিকায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। তবে তালিকায় থাকা এসব জেলের একটি বড় অংশ প্রকৃত মৎস্যজীবী নন বলে অভিযোগ করেছেন পদ্মাপাড়ের জেলেরা। তাদের দাবি, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যানচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ জেলে পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সরকারি সুবিধা পেলেও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক প্রকৃত জেলে তালিকায় স্থান পাননি। জেলে পরিচয়পত্রের সুবাদে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা প্রতি বছর খাদ্যসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা পেয়ে থাকেন। অথচ স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন যারা জীবনে কখনো মাছ শিকার করেননি কিংবা নিয়মিত নদীতে যান না।
প্রতি বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উপজেলা মৎস্য অফিসের মাধ্যমে জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করা হয়। এ জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটিও রয়েছে। তবে মৎস্য অফিসের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতেই জেলেদের নিবন্ধন করা হয়েছে। তালিকাটি পুনরায় হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।
শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, জেলে তালিকায় কোনো অপ্রকৃত জেলের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে এবং এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে সেই নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইলিশ আহরণ ও মৎস্য পেশার সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রকৃত জেলেদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলেদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচএম ইবনে মিজান বলেন, জাল যার, তিনিই প্রকৃত জেলে। এর বাইরে অন্য কোনো পেশার ব্যক্তির জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকাটি পুনরায় যাচাই করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্ত করা এবং অন্য পেশার কেউ থাকলে তাদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের পদ্মাপাড়ের কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে মাছ শিকারই জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নদীতে মাছ ধরা ছাড়া যাদের সংসার চালানোর অন্য কোনো উপায় নেই, এমন অনেক পরিবারই এখনও সরকারি জেলে তালিকার বাইরে রয়েছে। ফলে তারা নিয়মিত সরকারি খাদ্য সহায়তাও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন।
তাদের দাবি, বিপরীতে মাছ শিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যানচালক ও আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদেরও জেলে কার্ড রয়েছে। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকায় কয়েক হাজার ভুয়া জেলের নাম থাকতে পারে। পাশাপাশি কয়েকশ প্রকৃত জেলে এখনও তালিকার বাইরে রয়েছেন বলে তাদের অভিযোগ। সরেজমিন চরজানাজাত ইউনিয়নের আয়নাল খাঁ, ইলিয়াস বেপারি, বাচ্চু মোড়লসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার কয়েকজন তালিকাভুক্ত জেলের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হয়। তাদের অভিযোগ, তালিকায় থাকা এসব ব্যক্তির অনেকেই পেশাদার মৎস্যজীবী নন। একই এলাকার তালিকাভুক্ত আয়নাল খাঁ ও মালেক ফকিরসহ কয়েকজনের বাড়িতে গিয়ে তাদের কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের দাবি, তারাও নিয়মিত জেলে হিসেবে বরাদ্দ পাওয়া চাল পেয়েছেন।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিবচরে মোট ৬ হাজার ৫৪২ জন জেলে নিবন্ধিত রয়েছেন। এর মধ্যে শিবচর পৌরসভায় রয়েছেন ২৯৯ জন। ইউনিয়নগুলোর মধ্যে বন্দরখোলায় ৬৭২, সন্ন্যাসীরচরে ১৭০, বহেরাতলা দক্ষিণে ৩৪৫, চরজানাজাতে ৯৫১, কাঁঠালবাড়িতে ৪২১, মাদবরের চরে ২৮৭, বহেরাতলা উত্তরে ৮৯, ভান্ডারীকান্দিতে ২২০, বাঁশকান্দিতে ৫৬৪, নিলখীতে ৪৮৮, শিরুয়াইলে ৩৫৩, দত্তপাড়ায় ৪৩২, কাদিরপুরে ২৮৫, কুতুবপুরে ১৯৬, পাঁচ্চরে ১৫৪, দ্বিতীয়খণ্ডে ১৬৩, উমেদপুরে ১৬৬ এবং ভদ্রাসনে ২৭৬ জনকে জেলে হিসেবে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা