ইমেজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দর

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

সারাদেশ

বহির্নোঙরে প্রতিদিন গড়ে ৪৫ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করা থাকে চট্টগ্রাম বন্দরের। বেশিরভাগ জাহাজে থাকে বিদেশ থেকে আমদানি

2026-07-26T01:42:01+00:00
2026-07-26T01:42:01+00:00
 
  রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ইমেজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দর
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১:৪২ এএম 
চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি : সময়ের আলো
বহির্নোঙরে প্রতিদিন গড়ে ৪৫ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করা থাকে চট্টগ্রাম বন্দরের। বেশিরভাগ জাহাজে থাকে বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য। এসব জাহাজ থেকে গড়ে দৈনিক দেড় লাখ টন পণ্য খালাস করা হয় লাইটার জাহাজে করে। বিপুল আমদানি পণ্যের বড় অংশের খালাস চলে বহির্নোঙরেই। সেই বহির্নোঙরের বিশাল এলাকায় হঠাৎ তৎপর জলদস্যুরা। জাহাজ থেকে একের পর এক মূল্যবান মালামাল লুট হচ্ছে। গেল ১৮ দিনে তিন জাহাজ থেকে ১০ কোটি টাকার পণ্য লোপাট করা হয়। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেড়েছে আতঙ্ক, শঙ্কা। চুরি-ডাকাতি বাড়ায় চট্টগ্রাম বন্দর নতুন করে ইমেজ সংকটে পড়েছে।

ইতিমধ্যে দস্যুতা বন্ধে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে জরুরি চিঠি দেওয়া হয়েছে নৌপরিবহনমন্ত্রীর কাছে। অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বহির্নোঙরে চুরি বন্ধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি বহির্নোঙরে টানা অভিযান পরিচালনা করছে কোস্ট গার্ড। শনিবারও জাহাজে চুরির সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

বন্দর সূত্র জানায়, গত মাসের ২৯ জুন থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত তিন বিদেশি স্ক্র্যাপ জাহাজে হানা দেয় ডাকাত দল। লুটে নিয়ে যায় ১০ কোটি টাকার মালামাল। এর মধ্যে একটি জাহাজের লুট করা ২ কোটি টাকার মালামাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। কোস্ট গার্ডও অভিযান চালিয়ে জাহাজ থেকে খোয়া যাওয়া পণ্য উদ্ধার করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ থেকে পণ্য লোপাটের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তারা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। 

বন্দর সূত্র জানায়, ডাকাতির প্রথম ঘটনা ঘটে গত ২৯ জুন রাতে। বন্দর বহির্নোঙরের চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা এমভি হাই জু নামের জাহাজে ২৫ জনের ডাকাত দল হানা দেয়। এ সময় কোটি টাকার স্পেয়ার পার্টস ও মূল্যবান সরঞ্জাম নিয়ে তারা সটকে পড়ে। এই জাহাজ সীতাকুণ্ডের ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা হয়েছে। 

এ ঘটনার এক দিন পর গত ৩০ জুন বহির্নোঙরের একই এলাকায় এমটি আইরোস নামে জাহাজে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। জাহাজটির মালিক সীতাকুণ্ডের যমুনা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। এই জাহাজ থেকে পাঁচ কোটি টাকার মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। এ ঘটনার কয়েক দিন পর সিএমপির পতেঙ্গা থানা পুলিশ কিছু মালামাল উদ্ধার করে। 

তবে বেশিরভাগ লুট করা পণ্যই উদ্ধার করা যায়নি। সর্বশেষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে গত ১৬ জুলাই ভোরে। সিয়েরা লিয়নের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার এমটি তাই শুয়েনে হানা দেয় ডাকাত দল। লুট করে নিয়ে যায় প্রায় চার কোটি টাকার মুরিং রোপ ও ব্যাটারিসহ নানা সরঞ্জাম। ডাকাতির সময় তাৎক্ষণিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ঘটনা অবহিত করেছিল বন্দরের রেডিও কন্ট্রোল রুম ও কোস্ট গার্ডকে। কিন্তু দ্রুত সাড়া না পাওয়ায় লোপাট পণ্য নিয়ে নির্বিঘ্নে সটকে পড়ে ডাকাত দল। কম সময়ের ব্যবধানে জাহাজ থেকে পণ্য লোপাটের ঘটনা ঘটেছে বহির্নোঙরে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেড়েছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। 

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বহির্নোঙরে জাহাজে সম্প্রতি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বহির্নোঙরে নজরদারি বাড়ানো, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা, জাহাজের আগমনের তথ্য (ইটিএ) বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারসহ একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গেল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে অবহিত করেছে।

এতে বলা হয়, বহির্নোঙরে জাহাজে কয়েকটি চুরির অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বৃহস্পতিবার বন্দর সভাকক্ষে সদস্য (হারবার ও মেরিন), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডারসহ সমন্বয় সভা হয়। সভায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতে চুরি প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ করা হয়।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বহির্নোঙরে নিরাপত্তা জোরদারে কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল ও নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে জাহাজের আগমনের নির্ধারিত সময় (ইটিএ) কোস্ট গার্ডকে বাধ্যতামূলকভাবে জানাতে হবে। যাতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বহির্নোঙরে জাহাজগুলোতে সম্প্রতি চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরি ঠেকাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। বন্দরের মূল চ্যানেল ও বহির্নোঙরে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর করা হবে।

অন্যদিকে বহির্নোঙরে বিদেশি জাহাজে জলদস্যু হানা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। চেম্বারের মতে এক মাসে তিনটি বিদেশি জাহাজ থেকে কোটি কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নাবিকরা। 

বহির্নোঙরে জাহাজে জলদস্যুতা প্রতিরোধে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে জরুরি আবেদন করেছে চট্টগ্রাম চেম্বার। গেল ২২ জুলাই চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক স্বাক্ষরিত এক জরুরি চিঠিতে এই আবেদন জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, গত এক মাসে বহির্নোঙরে ৩টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার মালামাল, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে বিদেশি জাহাজের মালিক, শিপিং এজেন্ট এবং নাবিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির ধারণা বাড়বে, বীমা ব্যয় বাড়বে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বেড়ে যাবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আমরা দস্যুতা বন্ধে নৌপরিবহনমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে। ইতিমধ্যে দস্যুতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। আশা করছি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, বহির্নোঙরে চুরি ডাকাতি হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্মান ক্ষুণ্ন হবে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

শিপ হ্যান্ডলিং অপারটেররা ক্ষুব্ধ
চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বড় জাহাজের পণ্য খালাসের দায়িত্ব পালন করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা। সম্প্রতি ঘন ঘন ডাকাতির ঘটনায় অপারেটররা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এভাবে ডাকাতি বন্ধ না হলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। 

বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. সরওয়ার হোসেন বলেন, ডাকাতি হচ্ছে বহির্নোঙরে। হঠাৎ করেই বেড়েছে ডাকাতি। এটা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এভাবে চুরি ডাকাতির ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ।

চট্টগ্রাম বন্দর জাহাজে চুরি হচ্ছে বলছে। জাহাজে কি চুরি না ডাকাতি হচ্ছে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন ক্রুর সামনে কোটি টাকার মালামাল নিয়ে যাচ্ছে। এটা কীভাবে চুরি হতে পারে! এটা ডাকাতি।

বন্দর বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস হয় ছোট ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে। এসব জাহাজ পরিচালনা করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসিসি)। 

সংগঠনের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, বড় জাহাজে ছোট নৌকায় করে হঠাৎ করে চড়াও হয় দুর্বৃত্তরা। এরপর মালামাল নিয়ে যায়। বড় জাহাজে অনেক দিন কোনো ধরনের চুরি ডাকাতি হয় না। হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। বর্তমানে পোর্ট লিমিট এরিয়া বেড়েছে। তাই চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সময়ের আলো/এসএকে



  বিষয়:   ইমেজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: