করপোরেট বা ফ্রিল্যান্সিং- পেশা যাই হোক না কেন, আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ এখন কাটছে ডেস্কে, কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে। আপাতদৃষ্টিতে এই ডেস্কে বসে কাজ করা বেশ আরামদায়ক হলেও দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার ফলে আমাদের শরীর নিজের অজান্তেই ডেকে আনছে মারাত্মক সব শারীরিক ঝুঁকি। যাকে চিকিৎসকরা অনেক সময় ‘সিটিং ডিজিজ’ বা বসার রোগ বলেও অভিহিত করছেন।
মেরুদণ্ড ও পেশির ক্ষতি : সোজা হয়ে না বসে অনেকেই ডেস্কে কুঁজো হয়ে বা সামনের দিকে ঝুঁকে বসেন। এর ফলে ঘাড়, কাঁধ এবং পিঠের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘদিনের এই অভ্যাস থেকে ক্রনিক ব্যাক পেইন (কোমর ব্যথা) এবং ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়ার (সার্ভাইকাল স্পন্ডিলোসিস) মতো জটিলতা তৈরি হয়।
হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি : একটানা বসে থাকলে শরীরে ফ্যাট বা চর্বি পোড়ানোর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
মেটাবলিক সিন্ড্রোম ও ডায়াবেটিস : শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে শরীরের ইনসুলিন উৎপাদন ও ব্যবহারের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই সঙ্গে মেদভুঁড়ি ও ওজন বৃদ্ধি তো রয়েছেই।
রক্তসঞ্চালনে ব্যাঘাত ও ডিভিটি : দীর্ঘক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে থাকার কারণে পায়ের রক্তনালিতে রক্ত চলাচল ধীর হয়ে যায়। এর ফলে পায়ে পানি নামা বা ফুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। মারাত্মক ক্ষেত্রে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে ‘ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস’-এর মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
চোখের ক্লান্তি বা ‘কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোম’ : টানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া (ড্রাই আই), চোখ জ্বালাপোড়া করা, ঝাপসা দেখা এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
ঝুঁকি এড়াতে করণীয়
অফিসের কাজের টেবিল বা ডেস্ক পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে কিছু সচেতন অভ্যাস গড়ে তুললে এই ঝুঁকিগুলো সহজেই এড়ানো সম্ভব-
২০-২০-২০ নিয়ম মানুন : চোখের ক্লান্তি দূর করতে প্রতি ২০ মিনিট পরপর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন।
পেশির সচলতা : প্রতি এক ঘণ্টা পরপর ডেস্ক ছেড়ে অন্তত ৫ মিনিটের জন্য উঠুন। একটু হেঁটে আসুন বা দাঁড়িয়ে শরীরটা স্ট্রেচ (হাত-পা প্রসারিত) করে নিন।
বসার সঠিক ভঙ্গি : চেয়ারে বসার সময় পিঠ সোজা রাখুন। কম্পিউটার স্ক্রিন যেন চোখের সমান্তরালে থাকে, যাতে ঘাড় বাঁকাতে না হয়। পায়ের পাতা মেঝেতে সমান্তরালভাবে রাখুন।
পর্যাপ্ত পানি পান : ডেস্কে সবসময় পানির বোতল রাখুন। পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং বারবার ওয়াশরুমে যাওয়ার বাহানায় শরীর কিছুটা সচল হওয়ার সুযোগ পায়।
অফিস শেষে শারীরিক কসরত : কর্মঘণ্টার পর দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন, যা সারা দিনের অলসতার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
জীবিকার তাগিদে ডেস্কে বসে কাজ আমাদের করতেই হবে, তবে তা যেন জীবনের চেয়ে মূল্যবান না হয়ে ওঠে। কাজের ফাঁকে একটু সচেতনতা এবং ছোট ছোট বিরতিই পারে আমাদের এই ‘বসে থাকার রোগ’ থেকে মুক্ত ও সুস্থ রাখতে।
সময়ের আলো/এসএকে