ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইংরেজি বিভাগে জালিয়াতির মাধ্যমে এক ভুয়া শিক্ষার্থী ভর্তির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত ভর্তি নথিতে নাম না থাকলেও ওই শিক্ষার্থী একটি সেমিস্টারজুড়ে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। ফলাফল প্রস্তুতের সময় বিষয়টি ধরা পড়ে। তবে প্রায় দুই সপ্তাহ পেরোলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিভাগ। ফলে ঘটনাটি বিভাগীয় পর্যায়েই ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে জালিয়াত চক্রকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
কমিটিতে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহা. তোজাম্মেল হোসেনকে আহ্বায়ক এবং ইবির আইন উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেনকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এছাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন ইবির উপ-রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) বদিউজ্জামান। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহা. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, চিঠি পেয়েছি। আগামী সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে কাজ করবো।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজি বিভাগে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভুয়া ভর্তি হন শামিমা আক্তার। তার শ্রেণি রোল ছিল ২৪১০১০৪। ভর্তি হওয়ার পর তিনি নিয়মিত ক্লাস করেন এবং প্রথম সেমিস্টারের সব পরীক্ষায় অংশ নেন। তবে ফলাফল প্রস্তুতের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়্যারে তার রোল নম্বরের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কমিটির নজরে এলে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধানে ভর্তি জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে গত ১১ জুলাই পরীক্ষা কমিটি এ বিষয়ে বৈঠক হয়। বিষয়টি বিভাগীয় সভাপতিকে জানানো হলে একই দিন জরুরি সভা করা হয়। সভায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ভর্তি-সংক্রান্ত কোনো নথি না থাকায় তার পরীক্ষা বাতিলের সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট স্টাফদের আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ দায়িত্বে ছিলেন উপ-রেজিস্ট্রার ইসরাত জাহান (সুইটি) ও সহকারী লাইব্রেরিয়ান মুরাদ হোসেন।
তবে বিষয়টির যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বা অ্যাকাডেমিক শাখায় চিঠি ইস্যু করার নিয়ম থাকলেও কোনো চিঠি দেয়নি বিভাগ। বরং বিভাগীয় স্টাফদের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে তথ্য যাচাই করা হয়। বিষয়টি প্রায় দুই সপ্তাহ বিভাগীয় পর্যায়ে থাকার পর প্রকাশ্যে আসে। এমন গুরুতর জালিয়াতির ঘটনা প্রশাসনকে অবহিত না করে বিভাগীয় পর্যায়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে বিষয়টি বাইরে জানাজানি হওয়ার পর গতকাল রোববার (২৬ জুলাই) ফের জরুরি সভা করে বিভাগ। সভায় গত ১১ জুলাইয়ের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত উপাচার্যকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি, বিভাগে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা উপ-রেজিস্ট্রার ইসরাত জাহান ও সহকারী লাইব্রেরিয়ান মুরাদ হোসেনের কাছে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র কাজ করেছে। তা না হলে ছাত্রত্ব না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা দিয়েছেন? আর জালিয়াতি চক্রকে সহায়তা দিচ্ছেন দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানরত বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের প্রভাবেই বিভাগ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইংরেজি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সর্বশেষ নিবন্ধিত শ্রেণি রোল ছিল ২৪১০১০৩ (রেজিস্ট্রেশন নম্বর : ২৪০০০৮৩৩)। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ভর্তি তালিকায় শামিমা আক্তারের নাম বা রোল নম্বর ছিল না। পরে অ্যাকাডেমিক শাখা থেকে ওই চূড়ান্ত তালিকা যথারীতি বিভাগে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই তালিকা অনুসারেই বিভাগে শিক্ষার্থীদের নথিভুক্ত করা হয়। বিভাগটির অফিসিয়াল কম্পিউটারে জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৪১০১০৪ রোল নম্বর যোগ করে শামিমা আক্তারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর তিনি নিয়মিত প্রথম সেমিস্টারের ক্লাস করেন এবং ফরম পূরণ করে পরীক্ষায়ও অংশ নেন।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শামিমা আক্তারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার স্বামী ও একই বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াছিন বলেন, শুরুর দিকে সে ক্লাস করে মজা পেয়ে গেছেন। তবে ভর্তির বিষয়ে সে আমাকে কিছুই জানাননি। এখন বিভাগের সভাপতি তাকে ডাকলে সে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। বিভাগ পরবর্তীতে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা আমি বলতে পারব না।
পরীক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মামুনুর রহমান বলেন, সমস্যাটি লিখিতভাবে বিভাগীয় সভাপতিকে জানানো হলে আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাছাড় আজ (২৬ জুলাই) বিভাগের সভাপতি ও সিনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে জরুরি সভা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিষয়টি উপাচার্যকে অবগত করা হবে।
চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী লাইব্রেরিয়ান মুরাদ হোসেন বলেন, অফিস সময়ের শেষ মুহূর্তে আমাকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিটি অফিসেই রেখে এসেছি। ভালো করে পড়িনি।
জালিয়াতির বিষয়ে বিভাগের উপ-রেজিস্ট্রার ইসরাত জাহান বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী এক বান্ধবীকে নিয়ে এসে জানায়, অনেক দিন ধরে ক্লাস করলেও তার নাম এন্ট্রি হয়নি। জানতে চাইলে সে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তি হওয়ার কথা বলে। পরে জানায়, সে দাদার কোটায় ভর্তি হয়েছে এবং তার রোল নম্বর ২৪১০১০৪ হবে। তার বান্ধবীও জানায়, সে অনেক আগে থেকেই ক্লাস করছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমার সঙ্গে এমন করবে, তা ভাবিনি। ভেরিফিকেশন না করায় আমার ভুল হয়েছে। তবে এটিকে গাফিলতি বলা যাবে কি না, জানি না।
বিভাগটির সভাপতি ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদ বলেন, পরীক্ষা কমিটি বিষয়টি অবগত করলে জরুরি সভা করা হয়। এতে বিভাগের শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে অভিযুক্তের পরীক্ষা বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট স্টাফদের সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়। স্টাফদের গাফিলতির বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি সভায় উঠেছিল। কমিটি করা যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে বৈঠকে একাধিক সিনিয়র শিক্ষক মত দেন, যেহেতু শিক্ষার্থীকে প্রথম এন্ট্রিতেই ধরা হয়েছে এবং তাকে কোনো সনদ দেওয়া হয়নি, সেহেতু মানবিক দিক বিবেচনায় স্টাফদের এ গাফিলতির জন্য সতর্ক করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে উপাচার্য ড. একেএম মতিনুর রহমান বলেন, তদন্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।
সময়ের আলো/জোই