আমেরিকায় সবচেয়ে ছোট্ট কচ্ছপকে বাঁচানোর লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কচ্ছপ দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘বগ কচ্ছপ’। ডিম থেকে বের হওয়ার পর একটি বাচ্চা কচ্ছপের আকার একটি মুদ্রার সমান,

2026-07-28T03:58:51+00:00
2026-07-28T03:58:51+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আমেরিকায় সবচেয়ে ছোট্ট কচ্ছপকে বাঁচানোর লড়াই
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫৮ এএম 
‘বগ কচ্ছপ’। সংগৃহীত ছবি
উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কচ্ছপ দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘বগ কচ্ছপ’। ডিম থেকে বের হওয়ার পর একটি বাচ্চা কচ্ছপের আকার একটি মুদ্রার সমান, আর পূর্ণবয়স্ক হলেও বড়জোর একটি কম্পিউটার মাউসের দৈর্ঘ্য পায়। ঘাড়ের গোড়ায় উজ্জ্বল কমলা, লাল বা হলুদ রঙের বাঁকানো দাগই এদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ছোট্ট মাথাটি খোলসের বাইরে বের করলেই সেই দাগ চোখে পড়ে। আকারে ক্ষুদ্র হলেও এই কচ্ছপকে ঘিরে চলছে এক বিশাল সংগ্রাম। বিলুপ্তির হাত থেকে তাদের রক্ষা করার সংগ্রাম।

উত্তর ক্যারোলিনার ব্লু রিজ পর্বতমালার জলাভূমিতে বহু বছর ধরে এই কচ্ছপ নিয়ে কাজ করছেন বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী জে. জে. অ্যাপোডাকা। হাঁটুসমান জলরোধী বুট পরে তিনি কাদাময় জলাভূমির ছোট ছোট গর্তে হাত ঢুকিয়ে খুঁজে ফেরেন কচ্ছপের আশ্রয়স্থল। বাইরে থেকে অগভীর মনে হলেও পানির নিচের ফাঁপা গর্তগুলোই বগ কচ্ছপের নিরাপদ আবাস। কখনো লম্বা লাঠি দিয়ে কাদা ও ঘাসে আলত করে খোঁচা দিয়ে শক্ত খোলসের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এদের প্রেমে পড়ে যাওয়া খুবই সহজ।’

কিন্তু এই মায়াবী প্রাণীটির অস্তিত্ব এখন চরম সংকটে। দক্ষিণাঞ্চলীয় বগ কচ্ছপ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপন্ন সরীসৃপগুলোর একটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হারিকেন হেলেন আঘাত হানার আগেই তাদের সংখ্যা কমছিল। ভয়াবহ ঝড় ও বন্যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। এখন  বিজ্ঞানী, স্বেচ্ছাসেবক ও সংরক্ষণকর্মীদের একটি জোট কচ্ছপটিকে রক্ষার জন্য একযোগে কাজ করছে।

অ্যাপোডাকা পরিচালিত ট্যাংলড ব্যাংক কনজারভেশন এবং অ্যাম্ফিবিয়ান অ্যান্ড রিপটাইল কনজারভেন্সি (এআরসি) ভূমির মালিক, অলাভজনক সংস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত জলাভূমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। হারিকেনের পর তাদের কাজ শুধু বেঁচে থাকা কচ্ছপ খুঁজে বের করা নয়; বরং ধ্বংস হয়ে যাওয়া আবাসস্থল পুনর্গঠন, নতুন প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও।

অ্যাপোডাকার মতে, কচ্ছপ রক্ষার কাজে কেবল গবেষণাগারে বসে করা যায় না। ‘হাতা গুটিয়ে কাদায় নেমে কাজ করতে হয়,’ বলেন তিনি। কারণ এই জলাভূমিগুলো এতটাই নাজুক যে সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ফলে স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে কাদা সরানো, জলপ্রবাহ পরিষ্কার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের মতো কঠিন কাজ করতে হচ্ছে।

বগ কচ্ছপের জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামের। এক ইঞ্চিরও কম লম্বা ডিমের অর্ধেকের কম সফলভাবে ফুটে বাচ্চা বের হয়। অনেক ডিম পানিতে ডুবে যায়, অতিরিক্ত তাপে নষ্ট হয় কিংবা শিকারিদের খাদ্যে পরিণত হয়। যারা জন্মাতে পারে, তাদেরও অপেক্ষা করে নতুন বিপদ। র‍্যাংকুন, স্কাঙ্ক, মিনক ও শিয়ালের মতো প্রাণীর কাছে বিশেষ করে নরম খোলসের বাচ্চা কচ্ছপ সহজ শিকার। 

প্রাকৃতিক শত্রুর পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ডও এই প্রজাতির জন্য বড় হুমকি। নগরায়ণ ও ভূমি উন্নয়নের কারণে জলাভূমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যে একটি বগ কচ্ছপের দাম কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হওয়ায় পাচারকারীদের লক্ষ্যেও পরিণত হয়েছে তারা। গবেষকদের গাণিতিক বিশ্লেষণ বলছে, বছরে মাত্র একটি ডিম পাড়া স্ত্রী কচ্ছপ হারালেও একটি পুরো জনসংখ্যা ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।

এই দীর্ঘদিনের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়া। হারিকেন হেলেন চার দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন গ্যালন পানি নামিয়ে আনে। টানা বৃষ্টিতে নদী-খাল উপচে পড়ে, জলাভূমি তলিয়ে যায় এবং পাহাড়ি ঢল বিপুল পরিমাণ পলি ও ধ্বংসাবশেষ এনে কচ্ছপের আবাসস্থলগুলোকে বদলে দেয়। কোথাও কোথাও কচ্ছপের নিরাপদ কাদাময় আশ্রয় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়।

ঠিক কত কচ্ছপ হারিয়ে গেছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি। কারণ বগ কচ্ছপ খুবই লাজুক। অন্য কচ্ছপের মতো তারা রোদ পোহাতে গাছের গুঁড়ির ওপর ওঠে না; বরং বেশিরভাগ সময় কাদা বা পানির নিচে লুকিয়ে থাকে। তাই সরাসরি গণনা নয়, বরং নমুনা সংগ্রহ ও গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করেই গবেষকদের জনসংখ্যা সম্পর্কে ধারণা নিতে হয়।

তবু আশার আলো নিভে যায়নি। দ্য নেচার কনজারভেন্সি পরিচালিত একটি জলাভূমিতে ঝড়ের পরও তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে কিছু বগ কচ্ছপ। অ্যাপোডাকার বিশ্বাস, এখান থেকেই ভবিষ্যতে নতুন আবাসস্থলে কচ্ছপ স্থানান্তর করে সংখ্যা পুনর্গঠন সম্ভব হবে। এই এলাকাটি গবেষকদের জন্যও একটি জীবন্ত শিক্ষাগার, যেখানে সফল সংরক্ষণ কৌশলের ফল দেখা যাচ্ছে।


একদিন এমনই একটি অনুসন্ধান অভিযানে এআরসির সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী এমিলি নোলান হঠাৎ আনন্দে বলে ওঠেন, ‘একটা পেয়েছি!’ তার হাতের তালুতেই সহজে ধরে রাখা যায় ছোট্ট কচ্ছপটিকে। খোলসের কিনারায় বিশেষ খাঁজ খুঁজে দেখে তিনি নিশ্চিত হন, এটি আগে চিহ্নিত করা হয়নি। অর্থাৎ এটি নতুন সদস্য। এরপর ক্যালিপার, ওজন মাপার যন্ত্র ও নথিপত্র ব্যবহার করে শুরু হয় কচ্ছপটির পরিচয় নিবন্ধনের কাজ।

ব্যাঙ ও ভেক নিয়ে গবেষণা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত এই ছোট্ট কচ্ছপই নোলানকে মুগ্ধ করেছে। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘ওরা সত্যিই দারুণ মায়াবী।’

বগ কচ্ছপের গল্প কেবল একটি ক্ষুদ্র প্রাণীকে রক্ষার গল্প নয়; এটি প্রকৃতির ভঙ্গুর ভারসাম্য রক্ষার লড়াইও। জলাভূমি বাঁচলে কেবল একটি কচ্ছপ নয়, টিকে থাকবে একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। তাই এই ছোট্ট প্রাণীকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখারই আরেকটি নাম।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   আমেরিকা  সবচেয়ে ছোট্ট  কচ্ছপ  বাঁচানো  লড়াই 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: