অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের অন্তত ২০টি শহর ও গ্রামে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বাড়িঘর ধ্বংস এবং বহু ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করাসহ একটি জাতিসংঘ স্থাপনাতেও তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস হামলাও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
সোমবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানায়, নাবলুসের বেইতা এবং রামাল্লার নিলিন শহরে সামরিক বাহিনী ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। জেনিনের আরাবাহ শহরে সামরিক বুলডোজার নিয়ে তাণ্ডব চালানো হয়। তুলকারেমে অভিযানে অন্তত ৫ ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইলি সেনারা। এ ছাড়া নাবলুসের বালাতা ক্যাম্প ও আসিরা আল-শামালিয়া এলাকা থেকে আরও ৪ তরুণকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের কুদস নিউজ জানিয়েছে, কারিয়ুত শহর থেকে এক মুমূর্ষু অন্তঃসত্ত্বা নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ইসরাইলি সেনারা অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেয়। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় ওই নারীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং তার গর্ভপাত ঘটে।
এদিকে জোরালো সামরিক অভিযানের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ইসরাইলি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবও তীব্র আকার ধারণ করেছে। রামাল্লার কাছের আবু ফুজায়া এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং হেবরনের আল-বুরজ গ্রামে জলপাই বাগানে গবাদিপশু ছেড়ে দিয়ে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিম জানান, বসতি স্থাপনকারীরা রাতের অন্ধকারে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে ঢুকে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অথচ ইসরাইলি বাহিনী তাদের থামানোর বদলে উল্টো আক্রান্ত ফিলিস্তিনিদেরই গ্রেফতার করছে। তিনি আরও জানান, ইসরাইলে আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে চরম ডানপন্থি জোট সঙ্গীদের সন্তুষ্ট করতে এবং ভোট বাড়াতেই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন এভাবে বাড়িয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরাইলি অভিযান ও সহিংসতা বন্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরব লিগের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বসতি স্থাপনকারীদের হামলাকে ‘নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর সংঘবদ্ধ তাণ্ডব’ বলে অভিহিত করেছেন।
স্পেন সরকার, আরব লিগ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও মিসরসহ একাধিক দেশ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তুলকারেমে একটি মসজিদে আগুন দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করে আরব লিগ সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি মারাত্মক ‘বিস্ফোরণের দিকে’ এগোচ্ছে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাবি মসজিদে হামলাকে ‘সুসংগঠিত ও ফ্যাসিবাদী অপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি বর্তমানে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্থির’। কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সতর্ক করে বলেন, ইসরাইল সরকার নিজেই বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবে ‘ইন্ধন দিচ্ছে’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রিজার্ভ অফিসার জানান, সেনা সংখ্যা কম থাকায় তারা সহিংসতা থামানোর বদলে কেবল ‘নীরব দর্শক’ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। আরব লিগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুটি মসজিদ, বেশ কিছু গাড়ি ও কৃষিজমিতে ইসরাইলি বসতকারীরা আগুন দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনায় অঞ্চলটিতে চলমান উত্তেজনা আরও বেড়েছে। পশ্চিমতীরের তাল গ্রামের কাছাকাছি এই হামলার ঘটনা ঘটল ইসরাইলি বসতকারীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি ও দুই ইসরাইলি নিহত হওয়ার মাত্র দুদিন পর।
বিবিসি জানিয়েছে, ওই সংঘর্ষের জন্য উভয়পক্ষই একে অন্যকে দায়ী করেছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, চরমপন্থি ইসরাইলি বসতকারীদের হামলা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ইসরাইল সরকারের উগ্র ডানপন্থি অংশের সমর্থনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, অধিকৃত পশ্চিমতীরের দুটি গ্রামে রাতভর হামলা চালানো হয়। এ সময় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর, সম্পদ লুট এবং বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে বিদ্বেষমূলক গ্রাফিতি লেখা হয়। কুসরা গ্রামের মেয়র জানিয়েছেন, ইসরাইলি বসতকারীরা নির্মাণাধীন একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। মেয়র আবদুল আজিম ওয়াদি বলেন, মসজিদের দেয়ালে ‘প্রতিশোধ’সহ বিভিন্ন সেøাগান লিখে দেওয়া হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কুসরায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে প্রমাণ সংগ্রহ করবে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পৃথক একটি ঘটনায় কুর গ্রামে আরেকটি মসজিদে আগুন দেওয়া হয়। হামলাকারীরা এই মসজিদের দেয়ালেও বিভিন্ন স্লোগান লিখে রেখে যায়।
গত শুক্রবার তাল গ্রামের কাছে সংঘর্ষে হতাহতের পর পশ্চিমতীরের বিভিন্ন গ্রামে ইসরাইলি বসতকারীদের একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পশ্চিমতীরে অভিযান চালিয়ে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এসব অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তাল গ্রামের সংঘর্ষের ঘটনায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ফিলিস্তিনির বাড়ি ধ্বংস করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতকারীদের হামলা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ দেখা দিলেও সহিংসতা কমার লক্ষণ খুব কমই দেখা যাচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমতীরে ১ হাজার ১১৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত। এর মধ্যে অন্তত ৩৫ জন বসতকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর সেখানে ইসরাইল শত শত বসতি গড়ে তুলেছে। এসব বসতিতে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসবাস করেন। ফিলিস্তিনিরা পশ্চিমতীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা নিয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। আন্তর্জাতিক আইনে ইসরাইলি বসতিগুলোকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি