নদীভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নড়াইল জেলায় অধিগ্রহণ করা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিপুল পরিমাণ জমি এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলার ১৬০টি মৌজায় ৭৯৬টি এলএ (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন) কেসের মাধ্যমে মোট ২ হাজার ৭৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। এসব জমি মূলত নদীর তীর সংরক্ষণ, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন ও সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৩৫০ একর জমি বর্তমানে স্থানীয় প্রভাবশালী ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। শুধু দখলই নয়, সরকারি এই সম্পত্তিগুলোর প্রায় অর্ধেকই ইতোমধ্যে অসদুপায়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ভুয়া রেকর্ড হয়ে গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কালনা-কালীগঞ্জ প্রধান সড়ক এবং কালিয়া উপজেলার পেরোলী এলাকাসহ ৩ টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মূল্যবান জমিতে অবৈধভাবে নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারি এসব জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচাবাজার, স্থায়ী দোকানপাট, বসতবাড়ি, এমনকি বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। বিশেষ করে কালিয়া উপজেলার পেরোলী এলাকায় নদী তীরবর্তী সরকারি নিচু জায়গায় প্রকাশ্যে বালু ভরাট করে জমি দখল করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাউবোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে মৌখিক অনুমতি নিয়ে এসব জায়গায় স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় দখলদাররা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সরকারি এসব সম্পত্তি দখল করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০টি ছোট-বড় হাট ও বাজার গড়ে উঠেছে, যেখানে স্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন অন্তত ৫ হাজার ব্যবসায়ী।
জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, বড় বড় বাণিজ্যিক বাজারগুলো উচ্ছেদ করা জটিল হলেও সরকার ইজারা প্রথা চালু করে রাজস্ব আদায় করতে পারে।
নড়াইল জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহাবুব মোরশেদ জাফর বলেন, ‘সরকারি জমি একবার ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেলে, তা বাতিল করা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া। আইনি জটিলতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। এই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দখলদাররা স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলে। তাই পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই দ্রুত উচ্ছেদ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইল শাখার সভাপতি মো. শাহ আলম ও স্থানীয় সমাজকর্মীরা জানান, নদীবেষ্টিত নড়াইল জেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারি সংরক্ষিত জমি দখল হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ রূপকল্প ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পরবর্তীতে নদী রক্ষা বা টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলে, জমি সংকটে তা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় অবিলম্বে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, জেলা প্রশাসন ও পাউবোর সমন্বিত অভিযান পরিচালনা, সীমানা পিলার ও সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন এবং ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যাচাই করার জোর দাবি জানিয়েছেন সাধারণ এলাকাবাসী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সার্ভেয়ার মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ২ হাজার ৭৫০ একর জমির মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ একর পাউবোর নামে রেকর্ড রয়েছে। বাকি জমির সরকারি মালিকানা ফিরে পেতে ইতোমধ্যে ৩০টি দেওয়ানি মামলা, ৫টি এলএসটি মামলা এবং ১৯টি নামজারি আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, ‘জমির রেকর্ড যাচাই ও সীমানা নির্ধারণের কাজ চলছে। বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে কয়েকবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে। জেলা প্রশাসন সার্বিকভাবে সহযোগিতা করলে পর্যায়ক্রমে জমি উদ্ধার করা হবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন নামে রেকর্ড হয়ে যাওয়া জমির মালিকানা ফিরে পেতে ইতোমধ্যে ৪টি এলএ কেস করা হয়েছে। বিভিন্ন নামে রেকর্ড হয়ে যাওয়া বাকি জমির জন্যও মামলার প্রস্তুতি চলছে।’
নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, ‘নদী দখলসহ সরকারি জমি উদ্ধারে জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জমি উদ্ধারের জন্য সহযোগিতা চাইলে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করা হবে। পর্যায়ক্রমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দখল হওয়া জমি উদ্ধার করা হবে।’
সময়ের আলো/মহু