বাংলাদেশ–ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পরিণতি ভিন্ন কেন?

খন্দকার ওবায়দুল্লাহ

রাজনীতি

২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন— দুটি ঘটনাই দক্ষিণ এশিয়ার

2026-07-28T18:08:12+00:00
2026-07-28T18:08:12+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
রাজনীতি
বাংলাদেশ–ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পরিণতি ভিন্ন কেন?
খন্দকার ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৬:০৮ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন— দুটি ঘটনাই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। উভয় ক্ষেত্রেই আন্দোলনের সূচনা হয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে, পরে তা রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা লাভ করে। তবে দুটি আন্দোলনের পরিণতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশে আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে, আর ভারতে আন্দোলনের চাপ সামলেও ক্ষমতায় টিকে থাকে নরেন্দ্র মোদির সরকার। প্রশ্ন হলো, একই অঞ্চলে, শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন দুটি আন্দোলনের ফল এত ভিন্ন হলো কেন?

বাংলাদেশ এবং ভারতের আন্দোলন দুটির সূচনা ও বিস্তারে কিছু মিল থাকলেও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার কৌশলে ছিল উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। সেই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত দুই দেশের রাজনৈতিক ফলাফলকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয় কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। পরে তা দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলমসহ আরও অনেকে। তাদের নেতৃত্বে আন্দোলন ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে আন্দোলন যত বিস্তৃত হতে থাকে, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসে।

একই সময়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। তাদের দাবি ছিল, টানা প্রায় ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গণগ্রেফতার, মামলা, নেতাকর্মীদের কারাবন্দি রাখা এবং বিরোধী রাজনীতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে দেশে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, জুলাই আন্দোলন সেই অসন্তোষেরও বহিঃপ্রকাশ। ফলে শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবিকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

অন্যদিকে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ব্যাপক গ্রেফতার, গুলি, প্রাণহানি এবং দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ এবং তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার পদক্ষেপ দেশ-বিদেশে সমালোচনার জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে। আন্দোলনের সময় তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের বক্তব্য ও ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। 

কিন্তু সরকার তাদের কাউকেই দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করায়নি। একইভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকেও আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ বা রাজনৈতিক সমঝোতার দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হয় এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।

ভারতের ২০২৬ সালের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ৬ জুন নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ‘সিজেপ’র উদ্যোগে আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে পাঁচ দফা সংস্কার প্রস্তাব প্রকাশ, অনির্দিষ্টকালীন অবস্থান, সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ এবং অন্যান্য প্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার দাবি অব্যাহত রাখেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও সমর্থন জানান। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধিকে গ্রেফতারের ঘটনাও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় এবং আন্দোলনকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে।

তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার শুরু থেকেই আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। আন্দোলনকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। সরকার পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) ৪৭ কর্মকর্তার পরিষেবা বাতিল করে। আন্দোলনের অন্যতম দাবি মেনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন কমানো, বিচারিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পুলিশের কিছু পদক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার একটি ন্যূনতম আস্থা তৈরি হয় এবং ৩৬ দিন পর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুটি আন্দোলনের তুলনা করতে গেলে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কোনো আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, জনসমর্থনের বিস্তার, গণমাধ্যমের ভূমিকা, আদালতের সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের পরিস্থিতিকে একেবারে একই কাঠামোতে বিচার করলে বাস্তবতার অনেক পার্থক্য আড়ালে থেকে যেতে পারে।

তাদের মতে, বড় ধরনের গণআন্দোলনের সময় সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনআস্থাকে ধরে রাখা। যখন জনগণ মনে করে সরকার তাদের কথা শুনছে, আলোচনার সুযোগ রাখছে এবং প্রয়োজনে দায় স্বীকার করছে, তখন উত্তেজনা অনেক ক্ষেত্রে প্রশমিত হতে পারে। বিপরীতে, যখন সংলাপের পথ সংকুচিত হয় এবং সংকটের জবাব মূলত কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   বাংলাদেশ  ভারত  শিক্ষার্থীদের আন্দোলন  সময়ের আলো  জুলাই গণঅভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: