গাইবান্ধায় লুট হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি বালু

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

বাঙালী নদীর বুক চিরে তোলা হয়েছিল লাখ লাখ ঘনফুট বালু। সরকারি খাতায় তার দাম কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। অথচ

2026-07-28T18:14:11+00:00
2026-07-28T18:14:11+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
গাইবান্ধায় লুট হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি বালু
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৬:১৪ পিএম 
বাঙালী নদীর পাড়ে সরকারি বালু। ছবি : সময়ের আলো
বাঙালী নদীর বুক চিরে তোলা হয়েছিল লাখ লাখ ঘনফুট বালু। সরকারি খাতায় তার দাম কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। অথচ গত এক বছরের বেশি সময় ধরে সেই বালু নিলামে ওঠেনি। ফলাফল— দিনে-রাতে ট্রাক্টরে করে তা চলে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে, আর সরকারের কোষাগার থেকে হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব।

গাইবান্ধার সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার একাধিক এলাকা ঘুরে এই চিত্রই উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও নিলাম কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সুযোগ নিয়ে এই বালু সরিয়ে নিচ্ছে, আর প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার গাফিলতি বা অনীহার কারণেই আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।

২০১৯ সালে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধা— এই তিন জেলায় বাঙালী-করতোয়া-ফুলজোর-হুরাসাগর নদী ব্যবস্থার আওতায় ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেজিং ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু হয়। কাজটি বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। এই দীর্ঘ কর্মযজ্ঞের মধ্যে গাইবান্ধার সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় বাঙালী নদীর ২৪ কিলোমিটার অংশে খনন সম্পন্ন হয়।

খননের সময় তোলা বালু নদীর তীরে ও আশপাশের এলাকায় স্তূপ আকারে সংরক্ষণ করে সেনাবাহিনী, যা পরে ধাপে ধাপে হস্তান্তর করা হয় জেলা প্রশাসনের কাছে। এই বালু বিক্রির জন্যই গঠিত হয় নিলাম কমিটি— প্রথমে পাঁচ সদস্যের, পরে ২০২৩ সালের আগস্টে পুনর্গঠিত হয়ে সাত সদস্যের কমিটিতে রূপ নেয়। কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), আর সদস্যসচিব পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী। সঙ্গে আছেন সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি এবং সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি ও দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা।


২০২৩ সালের জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে নিলাম কার্যক্রম চালিয়ে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ২২ মে তারিখের পর থেকে সেই ধারাবাহিকতা থমকে যায়। রাজস্ব শাখার এক বিজ্ঞপ্তির আওতায় ১৫টি প্যাকেজের মধ্যে অবিক্রীত ৯টি এবং সেনাবাহিনীর হস্তান্তর করা আরও তিনটিসহ মোট ১২টি প্যাকেজ আর নিলামে ওঠেনি।

এই স্থবিরতার নেপথ্যে অভিযোগের আঙুল উঠছে নিলাম কমিটির আহ্বায়ক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুনের দিকে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নিলাম প্রক্রিয়া কার্যত থমকে যায়। কারও কারও ভাষ্য, বর্তমান সরকারের উন্নয়নকাজ ব্যাহত করতে এবং প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এই ধীরগতি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিলাম-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে একাধিকবার এডিসি রাজস্বের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি সচিব পর্যায়ের রেফারেন্স দেওয়া হলেও তিনি চুপ থেকেছেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যে, গত ৩১ মার্চ জেলা প্রশাসক নিজে নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করে বালুর খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরদিনই বিষয়টি নিয়ে এডিসির কাছে যাওয়া হলেও তিনি গুরুত্ব দেননি বলে অভিযোগ।

সরেজমিন সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জের বিভিন্ন বালুর ডাইক ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। সাঘাটার দোহাইল-১ ও দোহাইল-২ ডাইকের বালু সম্পূর্ণ লুট হয়ে গেছে— এতটাই যে সেখানে বালুর কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। দাঙাবাড়ি ও কিংকরপুর ডাইকের বালুও আংশিকভাবে চুরি হয়েছে। অন্যদিকে নদী তীরবর্তী পাকুরতলা, কিংকর ও গোবিন্দগঞ্জের পারসোনাইডাঙা ডাইকের বালুর একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই নদীতে মিশে যাচ্ছে।

কিছু ডাইকে আবার দেখা গেছে ভিন্ন কৌশলড়্গাছ লাগিয়ে, ঘাস গজিয়ে বা জমির মালিকানা দাবি করে দখলের চেষ্টা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে সরকারি সম্পত্তি একসময় স্থায়ীভাবে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাবে।

স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, সম্পূর্ণ লুট হওয়া দুটি ডাইকসহ অন্যান্য জায়গা থেকে চুরি ও নদীতে বিলীন হওয়া মিলিয়ে অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ ঘনফুট বালু ইতোমধ্যে খোয়া গেছে, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা। অতিবৃষ্টির কারণে আরও বালু ভেসে যাচ্ছে নদীতে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।

স্থানীয়রা বলছেন, কাছাকাছি এলাকার ডাইকের বালু ফুরিয়ে যাওয়ায় এখন অবিক্রীত ডাইকগুলোর বালুর চাহিদা আরও বেড়ে গেছে। অথচ এক বছরের বেশি সময় ধরে এসব ডাইক নিলামে তোলার কোনো উদ্যোগই নেই। ফলে দিনে-রাতে অবাধে চলছে চুরি, যেন এই সম্পদ দেখভালের কেউ নেই।

জমির মালিক ও স্থানীয় কৃষক মোনারুল ইসলাম বলেন, দিনে-রাতে ট্রাক্টরে করে বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে কারা এই কাজ করছে, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন এবং জড়িতদের নাম প্রকাশেও অনীহা দেখান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহ, নিলাম প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার সুযোগে একটি চক্র সংঘবদ্ধভাবে এই বালু হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের প্রশ্ন— প্রশাসনের কোনো অংশের সঙ্গে এই চক্রের যোগসাজশ আছে কি না, নাকি প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই আগে থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বালু। বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নিলাম কমিটির সদস্য ও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, গত নভেম্বরে যোগদানের পর এ বিষয়ে কোনো বৈঠক হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, কমিটির গাফিলতিতে সরকারি সম্পদ লুট হয়ে থাকলে দায় তাদেরও বর্তাবে। অন্য কোনো কারণে এমনটা হয়ে থাকলে সেখানেও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

একই ধরনের কথা বলেন সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর। তিনিও নতুন যোগদানের কথা জানিয়ে বলেন, বৈঠক বা নির্দেশনা এলে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হবে।

নিলাম কমিটির সদস্যসচিব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এত দিনেও কেন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি এড়িয়ে যান।

আর যাঁর দিকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের আঙুল, সেই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রকল্পের নাম শোনামাত্র তিনি গুরুত্বপূর্ণ জুম মিটিংয়ের কথা বলে ফোন কেটে দেন। পরে দফতরে গিয়েও তার দেখা মেলেনি। একাধিকবার ফোন, খুদে বার্তা ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেস বলেন, সরকারি সম্পদ লুটপাট নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের উদাসীনতার ফল। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, সরকারি সম্পদ লুট বা চুরির ঘটনায় যাঁদের দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এত দিনেও কেন নিলাম হলো না এবং এর জন্য কারা দায়ী— সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

বালুর ডাইকগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে সাক্ষী হয়ে— তবে প্রতিদিনই তার আয়তন ছোট হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই, প্রশাসনের নীরবতা কাটবে কবে, আর সরকারের হারানো এই রাজস্ব কি আদৌ ফিরে পাওয়া যাবে?

সময়ের আলো/জোই



  বিষয়:   গাইবান্ধা  লুট  সরকারি  বালু  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: