বছরের একটি বড় সময় বন্যা, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। বর্ষা মৌসুমে নিরাপদ পানির উৎস তলিয়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় বিশুদ্ধ পানির সংকট। এমন বাস্তবতায় জলবায়ু সহনশীল পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গাইবান্ধায় ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন (সিআরডব্লিউএস)’ শীর্ষক একটি পাইলট প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, স্যানিটেশন উদ্যোক্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
দাতা সংস্থা ‘ওয়েস্ট অ্যান্ড ফিনিশ মনিটোরিয়াল’-এর কারিগরি সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘হোপ ফর দ্য পুওরেস্ট (এইচএফপি)’ এবং ‘আশা’ যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত ও জলবায়ু সহনশীল স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটি হলো নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষ। নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি মানবিক মর্যাদা ও টেকসই উন্নয়নেরও অন্যতম শর্ত। সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ধরনের উদ্যোগ সফল হবে বলে আমরা আশা করছি।
অনুষ্ঠানে এইচএফপি ও আশার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বন্যাপ্রবণ ও চরাঞ্চলে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এসব এলাকায় জলবায়ু সহনশীল নিরাপদ পানির উৎস স্থাপন, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় জনগণের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা হবে।
প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ‘পানি উদ্যোক্তা’ ও ‘স্যানিটেশন উদ্যোক্তা’ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক স্যানিটেশনসেবা সম্প্রসারণ, স্থানীয় কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে আচরণগত পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমে স্থানীয়ভাবে টেকসই স্যানিটেশনসেবা গড়ে উঠবে।
এইচএফপির এক প্রতিনিধি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
আশার প্রতিনিধিরা জানান, প্রকল্পের আওতায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যবিধি চর্চা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
সভায় জানানো হয়, প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বন্যাপ্রবণ ইউনিয়নগুলোতে বাস্তবায়ন করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, গাইবান্ধার মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের অন্যান্য বন্যাপ্রবণ ও চরাঞ্চলের জন্যও একটি কার্যকর মডেল হতে পারে।
তাঁদের মতে, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-৬’—সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ এবং ‘এসডিজি-১৩’- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ-বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য, জীবনমান ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/আতা