মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সন্ত্রাসী শুটার মান্নান নিহত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে দীর্ঘ এক বছর পার হলেও বহুল আলোচিত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা দিতে পারেনি পুলিশ। তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা ও পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন নিহতের পরিবার, যদিও নৌ পুলিশ বলছে তদন্ত কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ২৮ জুলাই সকাল দশটার দিকে গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের বড় কালীপুরা গ্রাম সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ঘটে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার কিছু সময় আগে একটি স্পিডবোটে করে ৭ জন সশস্ত্র যুবক নদীতে টহল দিচ্ছিল। এরপরই শুটার মান্নান ও হৃদয় বাঘসহ ৭ জন একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে নদীতে নামলে হেলমেট ও জ্যাকেট পরা ১৫-১৬ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী অন্য একটি ট্রলারে করে তাদের ধাওয়া করে।
ঘটনাস্থলে প্রায় ২০-২৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। হামলায় মান্নানের বুকে চাইনিজ রাইফেলের দুটি গুলি লাগলে ট্রলারেই তার মৃত্যু হয়। হামলার মুখ থেকে বাঁচতে ট্রলারে থাকা অন্য সঙ্গীরা নদীতে ঝাঁপ দেন। এতে হৃদয় বাঘসহ আরও অন্তত ৬ জন গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। ঘটনার পর সন্ত্রাসীরা ট্রলার ও স্পিডবোট নিয়ে চাঁদপুরের দিকে পালিয়ে যায়।
নিহত শুটার মান্নান (৪৫) গজারিয়ার ইমামপুর ইউনিয়নের জৈষ্ঠিতলা গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে। অস্ত্র চালনায় বিশেষ পারদর্শিতার কারণে এলাকায় সে শুটার মান্নান নামে পরিচিত ছিল। গজারিয়া থানাসহ বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধমূলক মামলা ছিল।
গজারিয়া নৌ পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পরদিন ২৯ জুলাই রাতে নিহত মান্নানের স্ত্রী সুমি আক্তার বাদী হয়ে ১৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এতে হোগলাকান্দি গ্রামের সাজেদুল হক লালুকে প্রধান আসামি করা হয়।
নিহতের পরিবারের দাবি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও পূর্ব বিরোধের জের ধরে লালু-জুয়েল গ্রুপ পেশাদার অস্ত্রধারীদের ভাড়া করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এছাড়া গুয়াগাছিয়ার নয়ন-পিয়াস বাহিনীর সদস্যরাও এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় বলে অভিযোগ করেন স্বজনেরা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের এক বছর অতিক্রান্ত হলেও মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন না আসায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও নিহতের স্ত্রী সুমী বেগম। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আমি মহিলা মানুষ, আমার লোকবল নেই বলে পুলিশ আমার সাথে ভালো ব্যবহার করছে না। তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পুলিশের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা না পেলে বিষয়টি শিগগিরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
তবে তদন্তে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও গজারিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শরজিৎ কুমার ঘোষ বলেন, এটি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা। সবদিক বিবেচনায় রেখে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত কাজ চালানো হচ্ছে। মামলার এজাহারনামীয় ১০ জন আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।কয়েকজন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, খুব শীঘ্রই আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের এক বছর কেটে গেলেও মূল নির্দেশদাতা ও জড়িত বাকি আসামিরা গ্রেফতার না হওয়ায় মেঘনা নদীবেষ্টিত গুয়াগাছিয়া ও ইমামপুরে সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশা, পুলিশ দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে।
সময়ের আলো/আতা