চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করল, তখন প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিল এটিই হয়তো নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির জন্য সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুযোগ। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির জ্যেষ্ঠ পুত্র যিনি প্রায় ৪৮ বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তিনি অবিরাম প্রচার চালিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, সমর্থন সংগ্রহ করেছেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে আসছিলেন। তার দাবি ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে ইরানের জনগণ তাকেই অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাবেন, আর তিনি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে তার আশা যেন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। মার্চ মাসে টেক্সাসে অনুষ্ঠিত কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে (সিপ্যাক) তিনি পান অভূতপূর্ব সংবর্ধনা। মঞ্চে ওঠার পর প্রায় ৪৫ সেকেন্ড ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক ও বিপুলসংখ্যক ইরানি-আমেরিকান তাকে দাঁড়িয়ে করতালি দেন। অনেকের হাতে ছিল বিপ্লব-পূর্ব ইরানের ‘সিংহ ও সূর্য’ পতাকা যা তার বাবার শাসনামলের প্রতীক।
সেই মুহূর্তে অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, পশ্চিমা সমর্থনে তিনি ইরানের পরবর্তী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবেন। কিন্তু মাত্র চার দিন পর ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভয়াবহ মন্তব্য করেন। ‘আমরা ইরানকে বিস্ফোরণে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছি অথবা যেমন বলা হয়, প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে দিচ্ছি!!!’ এই বক্তব্যের পর পাহলভি কোনো স্পষ্ট নিন্দা বা প্রতিক্রিয়া দিতে পারেননি, যা তার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। যারা লাখ লাখ ডলার ব্যয় করে তার প্রচার চালাচ্ছিলেন, তারা প্রথমবারের মতো সংশয়ে পড়েন।
রয়টার্সের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সিপ্যাকের সেই সাফল্যই ছিল রেজা পাহলভির উত্থানের চূড়া। এরপর ধীরে ধীরে সবকিছু উল্টোদিকে যেতে শুরু করে। প্রথম আঘাত আসে প্রশাসনিক স্তর থেকে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকে ‘ভালো মানুষ’ বললেও জানুয়ারিতে রয়টার্সকে স্পষ্টই বলেন, ‘নিজের দেশে তিনি কেমন করবেন, আমি জানি না।’ আড়ালে তার প্রশাসন পাহলভিকে পাশে সরিয়ে রাখতে শুরু করে।
জানুয়ারির শুরুতে তেহরানে বিক্ষোভের রক্তক্ষয়ী দমন নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দিতে যাওয়া এক ইরানি-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মীকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেন বক্তব্যে পাহলভির নাম উল্লেখ না করতে। সবচেয়ে বড় আঘাত আসে জুন মাসে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে শাসন পরিবর্তনের কোনো উল্লেখই ছিল না; বরং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানাতে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে সম্মত হয়।
এরপর ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্টই বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কখনোই বলেননি যে, তার লক্ষ্য রেজা পাহলভিকে ইরানের নেতা বানানো।’ এভাবে পশ্চিমা সমর্থনের ভরসাটাই তার হাত থেকে চলে যায়।
কিন্তু শুধু বাইরের রাজনীতিই নয়, পাহলভির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও তার সমর্থকদের আচরণও তার পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় অর্ধশতাব্দী বিদেশে থাকায় ইরানের ভেতরে কোনো সংগঠিত গণআন্দোলন তার নেই। তিনি নিজে দাবি করেন, দেশজুড়ে হাজারের বেশি গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে কিন্তু রয়টার্স তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। বিরোধী শিবিরকে একত্রিত করার ক্ষেত্রেও তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ হন।
২০২৩ সালে ‘জর্জটাউন কোয়ালিশন’ নামে বিভিন্ন ধারার বিরোধীদের একত্র করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ে যায় তার স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলভির আচরণের কারণে। এক বৈঠকে তিনি অন্য বিরোধী নেতাদের ‘কেউ না’ বললে সেখান থেকেই বিভাজন শুরু হয়। এ ছাড়া তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন সাঈদ ঘাসেমিনেজাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘হয় আপনি পাহলভির সঙ্গে, নয়তো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে’- এই একচোখা মনোভাব বাকি বিরোধীদের তার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
সমর্থকদের মধ্যে বিস্তৃত সহিংসতা ও অনুপযুক্ত আচরণও তার ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। লন্ডনে এক কুর্দি সাংবাদিককে নির্মমভাবে মারধর করা হয় শুধু এই কারণে যে, তিনি পাহলভির সমর্থকদের দাবি মেনে নিতে পারেননি। কানাডায় পাহলভির এক সমালোচক গণিতশিক্ষক মাসুদ মাসজুদিকে হত্যার অভিযোগে তার দুই সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ভিয়েনা, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ভিন্নমতাবলম্বীদের হুমকি দেওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য প্রচার করা এবং হামলার ঘটনা ঘটে। পাহলভি নিজে এসবের নিন্দা করলেও তার সমর্থকদের মধ্যে এই প্রবণতা ঠেকাতে বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেননি যা বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করে দেয়।
আর্থিক সমর্থকদের প্রতি তার অবহেলাও এক বড় কারণ। ইরানি-আমেরিকান বড় বড় ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ যাদের কোম্পানির সম্মিলিত মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি তারা সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছিলেন এই আশায় যে, তিনি পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করবেন এবং বিকল্প শাসনের কাঠামো তৈরি করবেন। তারা তাকে বিরোধীদের একত্রিত করার, সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দিলেও পাহলভি সেগুলো উপেক্ষা করেন। তার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ‘কোনো দাতা অর্থ দিয়েছেন বলে তার প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি আমার মিশন বদলাব না।’ এতে ব্যর্থ হয়ে অনেক সমর্থক তাকে আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহলভির পতন আসলে ইরান বিষয়ে পশ্চিমা কৌশলের বৃহত্তর ব্যর্থতারই প্রতিফলন। তারা বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণের জন্য কোনো গ্রহণযোগ্য, সংগঠিত বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। পাহলভি সবচেয়ে বেশি পরিচিত মুখ হলেও তার কাছে নেই দেশের ভেতরের শক্তি। নেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নেওয়ার সামর্থ্য। সবচেয়ে বড় কথা, যার ওপর তার সব ভরসা ছিল সেই যুক্তরাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত তাকে পাশ কাটিয়ে ইরানি সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় বসেছে। নিজেকে ‘গন্তব্যে পৌঁছানোর সেতু’ বললেও বাস্তবে তিনি কোনো পক্ষের কাছেই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। ফলে সুযোগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত তিনি মুখ থুবড়ে পড়েছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি